14/05/2026
ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ কখনো ফেসবুকে টক্সিসিটি ছড়ায় না
আমরা প্রতিদিন ফেসবুকে স্ক্রল করি। হঠাৎ করেই চোখ আটকে যায় একেকটি পোস্টে—কেউ কাউকে গালাগালি দিচ্ছে, কেউ উস্কানিমূলক মন্তব্য করছে, আবার কেউ অহেতুক নেগেটিভ শেয়ার দিয়ে পরিবেশ ভারী করে তুলছে। এটাই হলো "টক্সিসিটি"।
কিন্তু টক্সিসিটি শুধু গালাগাল বা রাগারাগি নয়। এর আরও সূক্ষ্ম রূপ আছে। যেমন—
নিজেকে ভালো প্রমাণ করতে অন্যকে খারাপভাবে উপস্থাপন করা।
কেউ যখন পোস্ট করে, "আমি খুব সৎ, আর ওই ব্যক্তি তো একদম অসৎ" — প্রমাণ ছাড়াই। এটাও টক্সিসিটি। কারণ এখানে নিজের ভালো দিক তুলে ধরতে অন্যের চরিত্রহানি করা হচ্ছে।
আরেকটা টক্সিসিটি হচ্ছে অন্য কে ভিলেন বানিয়ে নিজে ভিক্টিম রুল প্লে করে সিমপ্যাথি নেওয়া। এটাও এক ধরণের টক্সিসিটি।
আরও এক ধরনের টক্সিসিটি: কিছু মানুষ আছে যারা বাস্তবে ভুল করে, অন্যায় করে। কিন্তু ফেসবুকে নিজেদের এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন তারা একদম সৎ, নিরপরাধ, দেবদূত। আর তাদের আশেপাশের সব মানুষ যেন সব দোষের জন্য দায়ী।
তারা পোস্ট করে:
· "আমি তো সব সময় ভালো কিছু করতে চাই, কিন্তু আমার আশেপাশের মানুষগুলোই আমার পথের বাঁধা।"
· "আমার কোনো দোষ নেই, সবাই আমাকে ভুল বুঝছে।"
· "আমি সৎ, আর ওই লোকেরা সব খারাপ।"
এটি একধরনের মানসিক কারসাজি — নিজের ভুল ঢাকতে অন্যদের ওপর দোষ চাপানো। বাস্তবের দোষ অনলাইনে ঢেকে দিয়ে নিজের ইমেজ বানানোর নাম ভালো চরিত্র নয়।
ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ কখনো এসব করেন না। কেন?
১. তাঁরা দায়িত্ববোধ জানেন
ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ জানেন, ফেসবুক শুধু একটি প্ল্যাটফর্ম নয়—এটি জনসমক্ষে কথা বলার জায়গা। তাঁরা বোঝেন, একটি নেতিবাচক মন্তব্য সত্যিকার মানুষের মনে আঘাত দিতে পারে। নিজেকে ভালো দেখানোর জন্য অন্যের মন্দ করাটা তাঁদের কাছে অগ্রহণযোগ্য। আর নিজের ভুল ঢাকতে অন্যকে দোষানো তো দূরের কথা।
২. তাঁদের সংবেদনশীল বুদ্ধিমত্তা বেশি থাকে
যাঁদের ব্যক্তিত্ব শক্ত, তাঁরা রাগ, হতাশা বা ক্ষোভ তাৎক্ষণিকভাবে ছড়ান না। বরং তাঁরা ভাবেন, "আমি যা লিখছি, সেটা কি কাউকে কষ্ট দেবে?" এমনকি নিজেকে ভালো প্রমাণের জন্যও তাঁরা কাউকে খারাপ উপস্থাপন করেন না। তাঁরা জানেন, নিজের ভুল স্বীকার করাও বড়ত্বের লক্ষণ, আর অন্যদের দোষিয়ে নিজেকে বাঁচানো হলো দুর্বলতার পরিচয়।
৩. তাঁরা গঠনমূলক কথায় বিশ্বাসী
টক্সিসিটির বিপরীত হচ্ছে গঠনমূলক সমালোচনা বা সৃজনশীল কথোপকথন। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ কাউকে অপমান না করেও ভিন্নমত জানাতে পারেন। নিজের ভালো দিক তুলে ধরতে পারেন অন্যের দোষ গুনে না দেখিয়ে—নিজের কাজ, অর্জন ও মূল্যবোধ শেয়ার করে। তাঁরা বোঝেন, "আমি তোমার সাথে একমত নই" আর "তুমি বোকা"—এই দুই বাক্যের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
৪. নিজের মানসিক শান্তির জন্যও নয়
যে ব্যক্তি অনলাইনে টক্সিসিটি ছড়ায়, সে আসলে নিজের অশান্তি বাইরে ঢেলে দেয়। আর যে নিজেকে ভালো প্রমাণ করতে অন্যকে খারাপ করে বা নিজের ভুল ঢাকতে অন্যদের দোষায়, সে আসলে নিজের ভিতরের নিরাপত্তাহীনতা লুকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ নিজের মানসিক শান্তিকে প্রাধান্য দেন। তাঁরা জানেন, নেতিবাচকতায় জড়ালে নিজেরও ক্ষতি।
৫. অন্যদের জন্য উদাহরণ হতে চান
তাঁরা উপলব্ধি করেন, তাদের একটু সংযত আচরণ হয়তো আরও দশজনকে ভালো পথে ফিরিয়ে আনতে পারে। তাঁরা দেখাতে চান যে নিজেকে ভালো প্রমাণ করার মানে অন্যের খারাপ দিক দেখা নয়—বরং নিজের ভালো দিকটাকে উজ্জ্বল করা। আর নিজের ভুল হলে সেটি স্বীকার করে নেওয়াও বড়ত্বের পরিচয়।
ফেসবুক আমাদের চিন্তা-আবেগ প্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। কিন্তু ব্যক্তিত্বের প্রকৃত পরিমাপ হয় যখন কেউ পর্দার আড়ালেও সভ্য থাকতে পারে।
নিজেকে ভালো প্রমাণ করতে গিয়ে অন্যকে খারাপ উপস্থাপন করা একধরনের টক্সিসিটি। নিজের দোষ ঢেকে ফেসবুকে সৎ সাজা আর আশেপাশের মানুষদের—বিশেষ করে কলিগ, প্রতিবেশী, বন্ধু ও পরিবারকে—দোষী বানানোও টক্সিসিটি। এসব ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের কাজ নয়।
তাই আমরা যদি চাই নিজেদের ব্যক্তিত্বকে সমৃদ্ধ করতে, তাহলে টক্সিসিটি ছড়ানো তো দূরের কথা, তা থেকে বিরত থাকাটাও যেন আমাদের অভ্যাস হয়।
কারণ সত্যিকারের বড় মানুষ কাউকে ছোট করে নিজে বড় হন না—বরং অন্যদেরও বড় হতে সাহায্য করেন। আর সত্যিকারের সৎ মানুষ ফেসবুকে সাজেন না—বাস্তবে থাকেন।