18/07/2026
শেষ কাপে চা
#কামিনীকাঞ্চনকল্পনা✍️
পর্বসংখ্যা ১১
সেই রাতে মোচি গেটে বৃষ্টি হয়েছিল, খুব বেশি নয়।
এমন এক বৃষ্টি, যা ধুলো ধুয়ে দেয়, কিন্তু মানুষের ভেতরের অস্বস্তি ধুয়ে দিতে পারে না।
ভোরে গলির ইটগুলো বৃষ্টির পানিতে চকচক করছিল। ছাদের কার্নিশ থেকে টুপটাপ করে পানি পড়ছিল। রেহমান নানওয়ালার তন্দুরে আগুন ধরতেই ভেজা কাঠের গন্ধ পুরো গলিতে ছড়িয়ে পড়ল।
হামিদ রউফ রিকশা বের করার আগে দরজার চৌকাঠে এক মুহূর্ত দাঁড়ালেন।
এই অভ্যাসটা তাঁর বহু বছরের।
বের হওয়ার আগে একবার ঘরটার দিকে তাকান—সাকেরা রান্নাঘরে, সাইফ বই হাতে, রুমাইসা জানালার পাশে। যেন প্রতিদিন নিজের পৃথিবীটাকে চোখে ভরে নিয়ে তবেই রাস্তায় নামেন।
---
সকাল গড়িয়ে দুপুর।
আনারকলি বাজারে যাত্রী নামিয়ে হামিদ যখন রিকশা ঘুরিয়ে ফিরছিলেন, তখন একটি সাদা গাড়ি তাঁর সামনে এসে ধীরে থামল।
গাড়ি থেকে নেমে এলেন মাঝবয়সি এক ভদ্রলোক।
পরিপাটি শাল, হাতে দামি ঘড়ি।
মুখে হাসি, কিন্তু সেই হাসিতে উষ্ণতা নেই।
তিনি বললেন,
— "আপনি হামিদ সাহেব?"
হামিদ মাথা নাড়লেন।
— "জি।"
— "চলুন, সামনের চায়ের দোকানে বসি। পাঁচ মিনিটের কথা।"
হামিদ চারপাশে তাকিয়ে বললেন,
— "কথা থাকলে এখানেই বলুন।"
লোকটি মৃদু হেসে বলল,
— "আপনি খুব সতর্ক মানুষ।"
— "জীবন শিখিয়েছে।"
লোকটি পকেট থেকে একটি ভিজিটিং কার্ড বের করে এগিয়ে দিল।
কার্ডে লেখা—
ফারুক মাহমুদ
আইন উপদেষ্টা
হামিদ কার্ডটা হাতে নিলেন, কিন্তু পকেটে রাখলেন না।
ফারুক ধীরে বললেন,
— "যে দুর্ঘটনার সাক্ষী আপনি, সেটি আদালত পর্যন্ত গেলে অনেক ঝামেলা হবে।"
— "ঝামেলা যার, সে সামলাবে।"
— "আপনারও হবে।"
— "সত্য বলার জন্য?"
ফারুক কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
— "আপনার পরিবারের কথা ভেবে দেখুন।"
এই প্রথম হামিদের মুখের রেখা বদলে গেল।
নিজের জন্য হুমকি তিনি বহুবার শুনেছেন।
কিন্তু পরিবার...
সেটা অন্য কথা।
তিনি ধীরে উত্তর দিলেন,
— "পরিবারকে ভয় দেখিয়ে যে সত্য বদলাতে চায়, সে নিজের মিথ্যাকেই সবচেয়ে বেশি ভয় পায়।"
ফারুক আর কথা বাড়াল না।
গাড়িতে উঠে চলে গেল।
---
বিকেলে বাড়ি ফিরে হামিদ ঘটনাটা কাউকে বললেন না।
কিন্তু সাকেরা বুঝলেন কিছুএকটা হয়েছে
খাওয়ার সময়ও যেন হামিদ অন্য কোথাও তাকিয়ে আছেন।
রাতে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
— "কিছু লুকাচ্ছ?"
হামিদ একটু হেসে বললেন,
— "সব কথার উওর জানতে নেই।"
সাকেরা উত্তর দিলেন,
— "সব কথা, সুখ,দুঃখ ভাগ করে নেওয়ার নামই তো সংসার।"
হামিদ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রইলেন।
এত বছর পরেও এই নারী তাঁর মনের ভেতরটা পড়ে ফেলতে পারেন।
শেষ পর্যন্ত তিনি সব খুলে বললেন।
সাকেরা দীর্ঘক্ষণ চুপ রইলেন।
তারপর বললেন,
— "আমি ভয় পাই।"
হামিদ স্ত্রীর হাতটা নিজের হাতে নিয়ে বললেন,
— "আমিও পাই। সাহস মানে ভয় না পাওয়া নয়। ভয়কে সঙ্গে নিয়েও ঠিক কাজটা করা।"
---
ওদিকে রুমাইসা স্কুল থেকে ফিরে দেখল, পাশের বাড়ির হিবা কাঁদছে।
তার পোষা কবুতরটা উড়ে গেছে।
হিবা ফুঁপিয়ে বলল,
— "ও আর ফিরবে না, আপু?"
রুমাইসা ছাদের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
— "যে সত্যি নিজের ঘরকে ভালোবাসে, সে পথ ভুললেও একদিন ফিরে আসে।"
কথাটা বলতে গিয়েই সে নিজে থেমে গেল।
নিজের অজান্তেই যেন নিজের জন্যই কথা বলে ফেলেছে।
---
সন্ধ্যায় হাজি ইদরিসের দোকানে আজ ভিড় একটু বেশি।
বিদ্যুৎ চলে গেছে।
হারিকেনের হলুদ আলোয় সবাই চা খাচ্ছে।
রাজনীতি, ক্রিকেট, বাজারদর—সব বিষয় নিয়ে তর্ক চলছে।
হাজি ইদরিস একসময় হেসে বললেন,
— "এই দোকানে চা ঠান্ডা হয়, কিন্তু তর্ক কখনো ঠান্ডা হয় না।"
সবাই হেসে উঠল।
ঠিক তখন মাওলানা ইউসুফ সাহেব হামিদের পাশে এসে বসলেন।
ধীরে বললেন,
— "একটা কথা মনে রেখো। সত্যের পথে হাঁটলে মানুষ কমে যায়। কিন্তু যারা থাকে, তারাই আসল মানুষ।"
হামিদ কোনো উত্তর দিলেন না।
শুধু চায়ের কাপটা হাতে তুলে নিলেন।
কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে।
তিনি তাকিয়ে রইলেন।
মনে হলো—
জীবনও বোধহয় এমনই।
ধোঁয়ার মতোই ক্ষণস্থায়ী।
কিন্তু সেই অল্প সময়েও উষ্ণতা ছড়িয়ে দেওয়াটাই মানুষের সবচেয়ে বড় কাজ।
---
রাত গভীর।
মহল্লার সব আলো নিভে গেছে।
হঠাৎ হামিদদের বাড়ির দরজায় তিনবার কড়া নাড়ার শব্দ হলো।
ঠক...
ঠক...
ঠক...
সাইফ দরজা খুলতে এগোতেই হামিদ হাত তুলে থামালেন।
তিনি নিজেই দরজার কাছে গেলেন।
ধীরে কপাট খুললেন।
বাইরে কেউ নেই।
শুধু চৌকাঠের ওপর একটি সাদা খাম।
খামের ভেতরে মাত্র একটি কাগজ।
তাতে কালো কালি দিয়ে লেখা—
"শেষ সুযোগ। আদালতে মুখ খুলবেন না।"
হামিদ কাগজটা ভাঁজ করলেন।
এক মুহূর্তের জন্য তাঁর চোখে উদ্বেগের ছায়া ফুটে উঠল।
তারপর তিনি কাগজটা হারিকেনের আগুনে ধরিয়ে দিলেন।
কাগজটা পুড়ে ছাই হয়ে গেল।
কিন্তু তিনি জানতেন—
হুমকি পুড়ে যায়,
হুমকিদাতারা নয়।
চলবে.................
(কপি করা নিষেধ❌❌)