19/08/2026
আস্ত খাসি না দেয়ায় যেই ছেলেটা বিয়ে ভেঙে দিয়েছিল সেই ছেলেটা আজকে পাশের গ্রামের অন্য একটা মেয়েকে বিয়ে করেছে।
আজকের বিয়েতে তাকে আস্ত খাসি দেয়া হয়েছে, সে ও হাসি হাসি মুখ করে গোগ্রাসে সেসব খেয়েছে।
তার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছিল সে জাপানে থাকে, টাকাপয়সা কামায় তাই যখন ইচ্ছে বিয়ে ভেঙে দিতে পারে, যখন ইচ্ছে বিয়ে করতে পারে- তাতে কনেপক্ষের যত ক্ষতিই হোক তার কিচ্ছু যায় আসে না।
যেই বিয়েটা সে ভেঙে দিয়েছিল সেই বিয়ের গেট থেকেই খারাপ ব্যবহার শুরু করেছিল বর জোনায়েদ। গেটে কনে পক্ষের লোকেরা তাকে সুন্দরমতো ফুল দিয়েছিল।
কিন্তু সে সেখানে থাকা মেয়েদের সাথে বাজে ব্যবহার শুরু করেছিল, টাকার গরম দেখানো শুরু করেছিল।
তারপর বরযাত্রীদের খাওয়া যখন প্রায় শেষের দিকে তখন সে উগ্র মেজাজ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করতে থাকে- তার পাতে আস্তে খাসি দেয়া হয়নি কেন?
মেয়ে পক্ষের লোকজন তখন নানাভাবে বুঝায় যে খাসির ব্যাপারটা আগে থেকে উল্লেখ করা ছিল না বলে এটা তাদের মাথায় ছিল না তাই তারা লজ্জিত।
মেয়ের বাবাও অনেকবার কাচুমাচু হয়ে অনুরোধ করেছিলেন কারণ বিয়েটা না হলে সমাজের মানুষ নানান কথা বলবে। কিন্তু তবুও বর শুনেনি।
সে বারবার জোরে জোরে একই কথা বলতে থাকে এবং
তর্কাতর্কি করতে থাকে।
মেয়ের বাবা তাকে সুন্দর সুরে বলেছিল - বিয়ের পরদিনই তো বউসহ আবার আসবে ওইদিনই আস্ত খাসির ব্যবস্থা করব, এখন বিয়েটা হয়ে যাক।
কিন্তু সে টাকার গরম দেখিয়ে বারবার রাগ দেখাচ্ছিল। তারপর একপর্যায়ে সে এ বিয়ে করবেনা বলে জানায়।
মেয়ের বাবার পাশাপাশি বর জোনায়েদের নিজের ভাই এবং আত্মীয়রাও তাকে বুঝাচ্ছিল কিন্তু সে মানেনি।
সে একপর্যায়ে তার নিজের ভাইকে বলে- তোর ইচ্ছা হলে তুই এই মেয়েকে বিয়ে কর আমি করতে পারব না। সাথে এটাও বলে যে- খাসি ছাড়া সে খাবে তবে আর কোনোদিন শশুর বাড়িতে আসবে না।
পাশে দাঁড়িয়েই মেয়ের বাবা এই কথাগুলো শুনছিলেন।আদরের মেয়েটার বিয়ের দিন বলে আজকে তার হাসিখুশি থাকার কথা ছিল কিন্তু বরের মুখ থেকে এসব কথা শুনে তার মনটা ভেঙেচুরে যাচ্ছিল।
এরপর সব বরযাত্রীদের খাওয়া যখন শেষ হয় তখন মেয়ের বাবা শক্ত কণ্ঠে জানিয়ে দেন- এই ছেলের কাছে তিনি মেয়ে বিয়ে দিবেন না।
ছেলে পক্ষের লোকেরা তাকে বুঝায় যে এতগুলো টাকা খরচ করে আয়োজন করেছেন, এতগুলো মানুষ খাইয়েছেন এখন বিয়েটা না হলে সমাজ কি বলবে?
কিন্তু মেয়ের বাবা শফিক মিয়া রাজি হন না।
তিনি ৩৫০ জনের উপর মানুষ খাইয়েছেন, কয়েক লাখ টাকা খরচ করেছেন কিন্তু এটাও বুঝতে পারছিলেন এই ছেলের সাথে মেয়ের বিয়ে দিলে সবসময় টাকাপয়সার খোটা দিবে, একটু এদিক সেদিক হলেই মেয়েটাকে মারধর করবে, বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিবে।
শফিক মিয়া হয়তো এতটা বড়লোক না কিন্তু তিনি ঠিকই এগুলো বুঝতে পারছিলেন। তাই নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রেখে বিয়ে দিতে না ই করেছেন।
তারপর শক্ত কণ্ঠে বরসহ তার আত্মীয়-স্বজনদেরকে চলে যেতে বলেন। পরে বিয়ের জন্যে বর পক্ষ থেকে আনা জিনিসপত্রও ফিরিয়ে দেন।
নিজের ইজ্জত বাঁচাতে বর জুনায়েদ পরে নতুন গল্প সাজিয়েছিল। সে বলেছিল মেয়ে পক্ষ নাকি কাবিনের টাকা ১০ গুণ চেয়েছে। অথচ বিয়েতে উপস্থিত লোকজন পর্যন্ত বলেছে এটা বানোয়াট, মিথ্যা কথা।
এখানকার মেয়ের বাবা শফিক মিয়া রবীন্দ্রনাথের অপরিচিতা গল্পের ক্যাণীর বাবা শম্ভুনাথ সেনের মতোই ব্যক্তিত্বসম্পন্ন।
শম্ভুনাথ সেনও বুঝতে পেরেছিল অনুপমের মামা বিয়ের পর তার মেয়ের নানান খুঁত ধরবে, খোটা দিয়ে অত্যাচার করতে চাইবে।
তাই বরযাত্রীদের খাওয়ানোর পরও তিনি বিয়েতে রাজি হননি। সমস্ত মালামালসহ বরযাত্রীদের পাঠিয়ে দিয়েছিল।
অপরিচিতা গল্পের মেয়ের বাবা শম্ভুনাথ সেন পেরেছেন, শফিক মিয়াও পেরেছেন কিন্তু এ সমাজের বেশিরভাগ বাবাই এটা পারতো না। কারণ তাদের কাছে সমাজ বড়, লোকজন কি বলবে সেটা বড়।
বিয়েতে টাকা খরচ করে খাইয়েছে এজন্যে বিয়েটা দিয়ে দিবে তারা, মেয়ে স্বামীর বাড়িতে গিয়ে যত কষ্টই পাক তাতে কিচ্ছু যায় আসে না।
ছেলে পক্ষের টাকার কাছে এদেশের সমস্ত মেয়ের বাবারাই ধরাসয়ী। তাদের কাছে বিয়ের বড় মানদন্ড হচ্ছে ছেলের টাকা আছে কিনা।
আর এজন্যেই জোনায়েদ নামের এ ছেলেটা বিয়ে ভাঙার পরদিনই নির্লজ্জের মতো দলবল নিয়ে অন্য জায়গায় বিয়ে করতে পেরেছে।
শম্ভুনাথ সেন শক্ত কণ্ঠে অনুপমের মামাকে বলেছিল- ঠাট্টার সম্পর্কটাকে স্থায়ী করার ইচ্ছা আমার নাই। কিন্তু এদেশের বহু বাবারাই টাকার লোভে সম্পর্কটা স্থায়ী করার ইচ্ছা করে।
এমনকি বিয়ের পর স্বামী যদি মেয়েকে খোটা দেয়, নানান অযুহাতে মারধর করে তবুও মানিয়ে নিতে বলে।
পরিবারের কথা চিন্তা করে মেয়েরাও মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে, ভাবে একটা সময় পর হয়তো সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু দিন যায়, মাস ফুরায় হতভাগা মেয়েদের কোনকিছুই আর ঠিক হয় না।