মাটির সন্দেশের ছাঁচ,মাটির আমসপ্ত ছাঁচ,
মাটির প্রদীপ,মাটির ডিনার সেট,মাটির হাঁড়ি /পাতিল,মাটির কড়াই,মাটির বাটনা,মাটির ফুলদানি,মাটির শোপিস,মাটির লাইট হোল্ডার, মাটির ওয়াল টপ,মাটির আয়না,মাটির ওয়ালম্যাট ইত্যাদি মৃৎপণ্য সামগ্রী পাওয়া যায়। সন্দেশ ছাঁচের গল্প। আমি আজ কোনো মিষ্টির দোকানের গল্প বলবো না। তাদের কথা বলবো, যারা সন্দেশকে করে তোলেন দৃষ্টিনন্দন। তারা হলেন সেই অনামী শিল্পীরা, যারা সৃষ্টি করেন সন্দে
শের ছাঁচ। কোনো খাবার জিনিষ শুধু খেতে ভালো হলে হয় না, দেখতে সুন্দর না হলে, ষোলকলা পূর্ণ হয় না।
প্রধানতঃ মিষ্টির দোকানে এর ব্যাবহার দেখা গেলেও, এর জন্ম হয়েছিল কিন্তু বাংলার একেবারে অন্দরমহলে। ছাঁচ তিন ধরণের হয়… মাটির, পাথরের আর কাঠের। ১৮০০ শতকের মাঝের দিক থেকে, ব্যাবহার হতে থাকে এই ছাঁচ।
কাঠ আর পাথরের ছাঁচ তৈরী হয়, খোদাই করে। কিন্তু মাটির ছাঁচ বানানোর পদ্ধতিটা একটু অন্যরকম। প্রথমে উপযুক্ত মাটি পরিমাণমতো নিয়ে, সেটা দিয়ে ছাঁচের ডিজাইনটা বানিয়ে নিতে হয়। এরপর সেটাকে রোদে শুকিয়ে, তার উপর আরেক দফা অন্য একটা মাটির প্রলেপ চাপিয়ে, শুকিয়ে নেওয়া হয়। এই শুকনো ছাঁচ এবার আগুনে পুড়িয়ে নেওয়া হয়। আর এই পোড়ানোর জন্য সবথেকে উপযুক্ত হলো, ঘুঁটের আগুন। ছাঁচের রং ঘন কালো করার জন্য, নিভু নিভু আগুনেএগুলোকে প্রায় ১২ ঘন্টা পর্যন্ত ফেলে রাখাও হয়।
ভাবলে অবাক লাগে, একটা ছাঁচের পিছনে একজন শিল্পী কত পরিশ্রম লুকিয়ে থাকে।এই প্রসঙ্গে আমি একটা অন্য ছাঁচের কথা বলবো, যেটা এখন একটা বিলুপ্ত শিল্প… আমসত্ত্ব ছাঁচ। আমরা এখন বাজার থেকে যে আমসত্ত্ব কিনি, সেগুলো কিউব করে কেটে, সেলোফিন পেপারে মুড়ে বিক্রি হয়। কিন্তু একটা সময় ছিল, যখন এই আমসত্ত্ব বানানো হতো পাথরের ছাঁচে। সেই ছাঁচের শিল্পী ছিলেন সেই সময়ের ঘরের মা ঠাকুমারা। বাংলাতে বহুল ব্যাবহার ছিল পাথরের থালার। সেই থালায় ছুরি, ছেনি দিয়ে তারা ছাঁচের ডিজাইন তৈরী করতেন। এই কারণে, আমসত্ত্ব ছাঁচ কিন্তু সন্দেশের ছাঁচের থেকে সাইজে বেশ বড়ো।
এই ছাঁচের মাধ্যমে ঘটে যাওয়া সেই সমান্তরাল বিপ্লবের গল্পে।
একটা সময় ছিল, যখন বাংলার ঘরে ঘরে মা বোনেরা বানাতেন নারকেল সন্দেশ, ক্ষীরের বা ছানার সন্দেশ। তাদের হাতের অবসর সময়টা ওনারা ব্যাবহার করতেন বিভিন্ন গার্হস্থ্য শিল্পকলায়।
এরমধ্যেই সৃষ্টি হয়েছিল এই ছাঁচশিল্পের। এখানে তারা ফুটিয়ে তুলতেন, বিভিন্ন সামাজিক ঘটনাকে। পরবর্তীকালে, এই ছাঁচের ব্যাবহার শুরু হয় মিষ্টির দোকানে। বিভিন্ন সামাজিক রীতিনীতি, সামাজিক ঘটনা, চরিত্র খোদিত হতো এই ছাঁচে। বিয়ের অনুষ্ঠানে গোটা মাছের সন্দেশ, গায়ে-হলুদ এবং ফুলশয্যার সন্দেশ তো এখনো ব্যাবহার হয়। এছাড়াও জামাইষষ্ঠী, ভাইফোঁটা সন্দেশ তো আছেই! এসেছে বিভিন্ন পশু-পাখির ছাঁচ।
বিভিন্ন সন্দেশের ছাঁচ হয়ে উঠেছিল, সেই সময়ের সমাজের এক সমান্তরাল দর্পণ। সেই প্রথা আজও বর্তমান। তাই সবাইকে অনুরোধ করবো, এর পর থেকে যখন কোনো দৃষ্টিনন্দন সন্দেশের স্বাদে মুগ্ধ হবেন, তার আগে একটু মনে করবেন এই সন্দেশের নেপথ্যে কোনো এক অজানা শিল্পীর কথা…