10/08/2026
আমার পিচ্চি মেয়েটা বড় হয়ে যাচ্ছে।
একটা সময় ছিল, ওকে দেখতে দেখতেই আমার দিন কেটে যেত। কখন একটু বড় হলো, কখন কথা বলার ধরন বদলালো, কখন নিজের মতো করে ভাবতে শিখলো—কিছুই যেন টের পেলাম না।
এখনো ওকে দেখি।
শুধু পার্থক্য হলো—এখন ওর বড় হয়ে ওঠাটা চোখে পড়ে।
এখনো একটা শিশু ছোট একটা ভুল করলে মানুষ হেসে বলে,
“আহা, বাচ্চা তো!”
কিন্তু আর কয়েক বছর পর?
সেই একই শিশুর ভুল তখন আর “ভুল” থাকবে না।
হয়ে যাবে—
“স্বভাব।”
“অভ্যাস।”
“বদমাশির লক্ষণ।”
“দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।”
“আজকালকার বাচ্চাদের সমস্যা।”
কিন্তু একটা প্রশ্ন কি আমরা করব?
সে এমন হলো কেন?
আমরা কি কখনো আচরণের পেছনের কারণ খুঁজতে শিখেছি?
নাকি মানুষ হিসেবে আমাদের সবচেয়ে সহজ কাজটাই আমরা করি—
দোষী খুঁজি।
একটা শিশু রুড?
রুড কেন?
একটা শিশু দায়িত্বজ্ঞানহীন?
দায়িত্ব শেখানো হয়েছিল কি?
একটা শিশু মিথ্যা বলে?
সত্য বললে সে নিরাপদ ছিল কি?
একটা শিশু প্রচণ্ড রাগী?
তার রাগের ভাষা কি কেউ কখনো বুঝতে চেয়েছে?
একটা শিশু চুপচাপ?
সে কি শান্ত, নাকি ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ছে?
আমরা খুব অদ্ভুত এক সমাজে বাস করি।
আমরা শিশুকে মানুষ করার চেয়ে শিশুকে বিচার করতে বেশি আগ্রহী।
আমরা চাই শিশু disciplined হোক, কিন্তু তাকে discipline শেখানোর সময় নেই।
আমরা চাই সে responsible হোক, কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তার সব কাজ আমরা নিজেরা করে দিই।
আমরা চাই সে emotionally mature হোক, কিন্তু তার সামনে নিজেদের রাগ, ঝগড়া, অপমান, হতাশা—সবকিছু নির্দ্বিধায় প্রকাশ করি।
তারপর একদিন যখন সেই শিশুই আমাদের আচরণের প্রতিফলন হয়ে ফিরে আসে, আমরা অবাক হয়ে বলি—
“বাচ্চাটা এমন হয়ে গেল কেন?”
শিশু আসলে খুব নিষ্পাপ একটা আয়না।
আপনি তার সামনে যা রাখবেন, সে তার কিছু না কিছু ফিরিয়ে দেবে।
আপনি তাকে সম্মান দিলে সে সম্মান শিখবে।
আপনি তাকে অপমান করলে সে অপমান শিখবে।
আপনি তাকে দায়িত্ব দিলে সে দায়িত্ব শিখবে।
আপনি সবসময় তার হয়ে কাজ করে দিলে সে নির্ভরশীল হতে শিখবে।
আপনি তাকে ভয় দেখালে সে ভয় শিখবে।
আপনি তাকে কথা বলার সুযোগ দিলে সে যোগাযোগ শিখবে।
শিশুকে শুধু উপদেশ দিয়ে বড় করা যায় না।
শিশুকে পরিবেশ দিয়ে বড় করতে হয়।
জাপানের শিশুদের নিয়ে আমরা প্রায়ই উদাহরণ দিই।
ছোটবেলা থেকেই নিজেদের কাজ নিজেরা করা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা—এসবের সঙ্গে তাদের পরিচয় করানো হয়।
আর আমরা?
অনেক সময় শিশুর হাত থেকে কাজটা কেড়ে নিয়ে নিজেরাই করে দিই।
তারপর কয়েক বছর পর অভিযোগ করি—
“এই বাচ্চার কোনো sense of responsibility নেই!”
Responsibility মুখস্থ করানো যায় না।
Responsibility practice করাতে হয়।
আর discipline কোনো lecture নয়।
Discipline একটা culture।
এবার আসি আমাদের সমাজের আরেকটা বড় সমস্যায়—
আমরা শিশুদের খুব দ্রুত label করে দিই।
“মোটা।”
“কালো।”
“খাটো।”
“বাট্টু।”
“দেখতে ভালো না।”
“রুড।”
“বেয়াদব।”
“দায়িত্বজ্ঞানহীন।”
একটা শিশু হয়তো তখন হাসছে।
কিন্তু আপনি কি নিশ্চিত, সে কথাটা তার ভেতরে ঢোকেনি?
শৈশবে বলা একটা বাক্য কখনো কখনো একজন মানুষের সারা জীবনের insecurity হয়ে দাঁড়ায়।
আমরা একটা শিশুকে body shame করি, তারপর বড় হয়ে তার confidence কমে গেলে বলি—
“ও এত insecure কেন?”
আমরা তাকে অন্যের সঙ্গে compare করি, তারপর বড় হয়ে সে নিজের জীবনকে অন্যের জীবনের সঙ্গে তুলনা করতে থাকলে বলি—
“ও নিজের ওপর বিশ্বাস করে না কেন?”
আমরা তার কথা বারবার অগ্রাহ্য করি, তারপর বড় হয়ে সে যখন কারও কথা শুনতে চায় না, তখন বলি—
“ও খুব stubborn!”
অদ্ভুত না?
আমরা অনেক সময় যে আচরণের বীজ নিজেরাই বপন করি, বড় হয়ে সেই আচরণের ফলের জন্য শিশুকেই দোষ দিই।
আর adolescence?
সেটা তো আরও জটিল একটা সময়।
একটা কিশোর বা কিশোরী হঠাৎ রুড হয়ে গেলেই আমরা বলি—
“আজকালকার ছেলেমেয়েদের attitude দেখেছ?”
কিন্তু তার ভেতরে তখন কী চলছে?
Hormonal change।
Identity crisis।
Peer pressure।
Bullying।
Body image।
Academic pressure।
Family conflict।
Loneliness।
Social media।
নিজেকে অন্যদের সঙ্গে তুলনা করা।
গ্রহণযোগ্য হওয়ার চেষ্টা।
নিজেকে খুঁজে পাওয়ার যুদ্ধ।
হাজারটা কারণ থাকতে পারে।
কিন্তু আমরা কারণ খুঁজি না।
আমরা character certificate দিয়ে দিই।
“তুমি রুড।”
“তুমি খারাপ।”
“তুমি বদলে গেছ।”
কখনো কি বলি—
“তোমার ভেতরে কী হচ্ছে, আমাকে বলবে?”
আমাদের শিশুরা শুধু ঘরে বড় হয় না।
তারা স্কুলে বড় হয়।
বন্ধুদের মধ্যে বড় হয়।
ইন্টারনেটে বড় হয়।
YouTube-এ বড় হয়।
Facebook, TikTok, Instagram-এ বড় হয়।
তাদের classmates তাদের শেখায়।
তাদের teachers শেখায়।
আমাদের কথাবার্তা শেখায়।
আমাদের আচরণ শেখায়।
আমাদের সমাজ শেখায়।
তাই একটা শিশুকে বুঝতে হলে শুধু শিশুটাকে দেখলে হবে না।
দেখতে হবে—
তার চারপাশটা কেমন।
সে কার সঙ্গে মিশছে?
কী দেখছে?
কী শুনছে?
কী ভাষায় কথা বলছে?
তার বন্ধুদের আচরণ কেমন?
স্ক্রিনে কী ধরনের content ঢুকছে?
বাড়িতে কী ধরনের emotional environment?
স্কুলে সে নিরাপদ তো?
কেউ তাকে bully করছে কি না?
সে কাউকে bully করছে কি না?
এসব প্রশ্ন না করে শুধু বললাম—
“বাচ্চাটা খারাপ।”
এটা parenting নয়।
এটা বিচার।
আর আমাদের সমাজ বিচার করতে খুব ভালোবাসে।
আমরা পশ্চিমা সমাজকে অনেক সময় “সভ্য” বলি।
কিন্তু সভ্যতার একটা বড় শিক্ষা হলো—
freedom-এর পাশাপাশি accountability থাকতে হয়।
আইন ভাঙলে consequence আছে।
অন্যায় করলে জবাবদিহিতা আছে।
নিয়ম আছে।
সিস্টেম আছে।
সেখানে মানুষ perfect নয়।
Crime হয়।
Aggression আছে।
মানুষের দুর্বলতা আছে। কিন্তু একটা কাঠামো আছে, যা মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—
“তুমি যা ইচ্ছা তাই করতে পারবে না।”
আর যেখানে নিয়ম দুর্বল, জবাবদিহিতা দুর্বল, শাস্তির নিশ্চয়তা দুর্বল—সেখানে মানুষ ধীরে ধীরে অন্যায়কে স্বাভাবিক ভাবতে শুরু করে। তারপর আরও ভয়ংকর একটা জিনিস ঘটে। মানুষ নিজের অন্যায়কে justify করার জন্য নতুন নতুন যুক্তি তৈরি করে। ধর্ম, নৈতিকতা, সমাজ—সবকিছুকেই কখনো কখনো নিজের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করা শুরু করে।
“ভুল করেছি, পরে ক্ষমা চেয়ে নেব।”
কিন্তু ক্ষমা চাওয়া যদি একই অন্যায় বারবার করার license হয়ে যায়—তাহলে সেটা অনুতাপ নয়। সেটা self-justification।
আমাদের সমস্যা শুধু এই নয় যে আমরা ভুল করি। মানুষ ভুল করবেই। আমাদের বড় সমস্যা হলো, আমরা ভুলের দায় নিতে চাই না। আমরা কারণ খুঁজতে চাই না।
আমরা নিজেদের দেখতে চাই না। আমরা বরং একজন মানুষকে দোষী বানিয়ে স্বস্তি পেতে চাই। কারণ অন্যকে দোষ দেওয়া খুব সহজ। নিজেকে প্রশ্ন করা কঠিন। তাই কোনো শিশুকে পরেরবার বিচার করার আগে একবার থামুন। তারপর নিজেকে জিজ্ঞেস করুন—
“এই শিশুটাকে আমরা কী দিয়েছি?”
নিয়ম দিয়েছি?
নাকি শুধু নিয়মের কথা বলেছি?
দায়িত্ব দিয়েছি?
নাকি সব কাজ নিজেরা করে দিয়েছি?
নিরাপত্তা দিয়েছি?
নাকি ভয়ের পরিবেশ দিয়েছি?
ভালোবাসা দিয়েছি?
নাকি ভালোবাসার সঙ্গে শর্ত জুড়ে দিয়েছি?
সম্মান দিয়েছি?
নাকি প্রতিদিন তার চেহারা, শরীর, বুদ্ধি, ফলাফল আর আচরণ নিয়ে মন্তব্য করেছি?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
আমরা নিজেরা কি সেই মানুষটি হয়েছি, যেরকম মানুষ আমাদের সন্তানকে হতে বলছি?
কারণ শিশুরা আমাদের কথা যতটা শোনে, তার চেয়ে অনেক বেশি—আমাদের দেখে।
আমরা যদি সত্যিই একটা ভালো প্রজন্ম চাই, তাহলে শুধু সন্তানকে বদলানোর প্রকল্প শুরু করলে হবে না।
নিজেদেরও একটু বদলাতে হবে।
তার character নিয়ে কথা বলার আগে তার পৃথিবীটা একবার দেখুন।
তাই প্রশ্নটা শুধু—“আমাদের বাচ্চারা কেমন হয়ে যাচ্ছে?”
প্রশ্নটা হওয়া উচিত—“আমরা তাদের কী হতে শিখিয়েছি?”
কারণ আগামী প্রজন্মকে বদলানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো—আগে নিজেদের আয়নায় দেখা।