10/07/2026
শাপলার ডাটার পাতুরি
পাতায় মুড়ে রান্না করা হয় বলে এর নাম পাতুরি। বহু পুরোনো রান্না তবে অনেক কিছুর মত এটাও ইদানিং বাঙালীর রান্নাঘরে ফিরে এসেছে।তার থেকেও বড় কথা বাঙালী অনুষ্ঠান বাড়িতে এখন পাতুরির জয়জয়কার। একটু কম বাজেট থাকলে রুই কি কাতলা মাছের পাতুরি, মাঝারি বাজেট হলে ভেটকি আর পয়সার অভাব না থাকলে ইলিশ বা গলদা চিংড়ির পাতুরি আজকাল বিয়ে, অন্নপ্রাশন, জন্মদিন, পৈতে এমনকি শ্রাদ্ধবাড়িতেও দেখা যাচ্ছে। এককথায় পাতুরি এখন আভিজাত্যের প্রতীক।রুই কাতলার কালিয়া এখন পিছনের সারীতে পাতুরির দাপটে।আভিজাত্যের প্রতীক এই পাতুরির জন্মবৃত্তান্ত সঠিকভাবে জানা না গেলেও পুরোনো মানুষদের কাছে এর জন্ম নিয়ে দুরকম মতবাদ পেয়েছি।
প্রথমত - কলাপাতায় মুড়ে রান্না বাঙালী বহুদিন ধরেই করে অভ্যস্ত। পিঠে, ডালসেদ্ধ আরও কয়েকরকম রান্না পাতায় মুড়ে করা হত। এবার কেউ যদি পরীক্ষানিরিক্ষা করার জন্য মাছকে মশলা মাখিয়ে পাতায় মুড়ে রান্না করতে চেয়েছেন ও সেই রান্নাটা বহুজনের ভালও লেগেছে, তবে নতুন রান্না হিসেবে পাতুরিকে মেনে নিতে আর আপত্তি ওঠার কথা নয়।
দ্বিতীয়ত - অভাবের সংসারে যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরিয়ে যায় সেখানে প্রতিদিন মাছভেজে রান্না করাটা বিলাসিতা মনে হয়েছে হয়তো কারুর। তেলের ব্যবহার কমানোর জন্য পাতায় অল্প তেল মাখিয়ে তার ভেতরে মশলাসমেত মাছটাকে দিয়ে একটা নতুন রান্নাও হয়েছে আবার তেলেরও সাশ্রয় হয়েছে।
তবে যেভাবেই হোকনা কেন একবার শুরু হওয়ার পর পাতুরিকে আর কোনদিন ফিরে তাকাতে হয়নি, এটা নিশ্চিত। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে পাতুরির সাম্রাজ্য।
আজও ছড়াচ্ছে দেশ থেকে বিদেশে।তা যেভাবেই হোক, পাতুরি বলতেই জিভে জল আসে অধিকাংশ বাঙালীর। মূলত কলাপাতায় মোড়া পাতুরি দেখতেই আমরা অভ্যস্ত। তবে কচি লাউ, কুমড়ো বা চালকুমড়ো পাতা দিয়েও পাতুরি বানানো যায়।তবে, আমি আজ শাপলা পাতুরি রেসিপি আপনাদের শেয়ার করবো।শাপলার পরিবার বা গোত্র হল Nymphaea। এটি একটি গ্রিক শব্দের অনুবাদ।গ্রীক দার্শনিক প্লেটো ও এরিস্টটল এর এক শিষ্য থিউফ্রাস্টাস বলেছেন, এই উদ্ভিদ প্রায় ৩০০ খৃস্টপূর্ব পুরানো। তিনি আরো বলেছেন প্রাচীন গ্রীকে জল দেবীদের এই ফুল উৎসর্গ করে উপাসনা করার রীতি ছিল।শাপলা প্রাচীন যুগ থেকেই বিভিন্ন জাতীর প্রার্থনা বা বাগান সাজানোর পাশাপাশি খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যেমন: মিশর, চীন, জাপান ও এশিয়ার বিভিন্ন এলাকা শাপলার কান্ড বা ডাটা বা পুস্পদন্ড সবজী হিসেবে খাওয়া হয়।পূর্ণবিকশিত শাপলা ফুলের গর্ভাশয়ে গুড়ি গুড়ি বীজ থাকে। আঠালো এই বীজ বাংলাদেশের গ্রামের মানুষদের খেতে দেখা যায়। এই বীজ ভেজে একধরনের খাবার খৈ তৈরি হয় যার নাম “ঢ্যাপের খৈ”। উদ্ভিদটির গোড়ায় থাকে আলুর মত এক ধরনের কন্দ যার নাম শালুক, অনেকে এটি সব্জি হিসেবে খেয়ে থাকে।নীল শাপলা ফুল ও লাল শাপলা ফুল ঘর সাজাতে ব্যবহৃত হয়। এটি বাগানের জলাধারে লাগানো বা অ্যাকোয়ারিয়ামে রাখার জন্য খুব জনপ্রিয় একটি উদ্ভিদ। কখনো কখনো এই উদ্ভিদ তাদের ফুলের জন্য বেড়ে উঠে।
শাপলা বাংলাদেশ ও শ্রীলংকার জাতীয় ফুল।ভারতে আম্বাল নামের আয়ুর্বেদিক ঔষুধ বানাতে শাপলাকে ঔষধি গাছ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এই ঔষধ অপরিপাকজনিত রোগের পথ্য হিসেবে কাজ করে। সাম্প্রতিক গবেষণায় পাওয়া গেছে এই উদ্ভিদে ডায়াবেটিক রোগের জন্য প্রয়োজনীয় ঔষুধি গুণাগুন রয়েছে।এই উদ্ভিদ পানি থেকে তুলে রোদে শুঁকিয়ে গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়।বাংলায় বলা হয় শাপলা। ইংরেজিতে শাপলাকে বলা হয় “Water Lily”, White Water Lily, White Lotus. অন্যান্য ভাষায়: থারো আংগৌবা (মনিপুরী), ভেলাম্বাল (তামিল), कुमुद কুমুদ (সংস্কৃত), শালুক (বাংলা), নিরাম্ব(মালয়ালম ভাষা), কান্নাইদিলি (কান্নাদা), নাল (আসামি ভাষা)। বাংলায় নীল শাপলা ফুলকে শালুক বা নীলকমল, লাল শাপলা ফুলকে রক্তকমল বলা হয়। চট্টগ্রাম এ এই ফুল কে অঁলাফুল বলা হয়।
গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া, টুঙ্গিপাড়া, কাশিয়ানী, মুকসুদপুর ও সদর উপজেলা বিল অধ্যুষিত। এসব খাল-বিল ও জলাশয় প্রাকৃতিকভাবেই জন্ম নেয় শাপলা ফুল। খাল-বিল ও জলাশয় থেকে শাপলা সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন প্রায় অর্ধলাখ মানুষ।শাপলা শুধু জাতীয় ফুলই নয়, নানা অঞ্চলের মানুষের কাছে সবজি হিসেবেও বেশ জনপ্রিয়। পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ এ শাপলা একদিকে যেমন সবজির চাহিদা মেটাচ্ছে, তেমনি বেকার মানুষের আয়ের পথ তৈরি করেছে।আজ আমি বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার একটি জনপ্রিয় রেসিপি শেয়ার করবো আপনাদের সঙ্গে। তাহলে আর দেরি কিসের, চটপট দেখে নেই এই অসাধারণ রেসিপি টা।
উপকরনঃ
শাপলাডাটা ১কাপ
সরষে বাটা ১ টেবিল চামচ
পোস্ত বাটা ১ /২ টেবিল চামচ
নারকোল বাটা ১/৪ কাপ
সাদা তিল বাটা ১/২ টেবিল চামচ
কাচা মরিচ বাটা ৪ টি
টক দই ১ টেবিল চামচ
লবণ পরিমাণ মতন
চিনি ১/২ চা চামচ
সরষের তেল পরিমাণ মতো
কলাপাতা
চালের গুড়ো ১ টেবিল চামচ
হলুদ গুড়ো ১/২ চা চামচ
প্রণালী:
প্রথমে শাপলাডাটা গরম পানিতে এক মিনিটের জন্য ভাপিয়ে নিতে হবে। তারপর একটি পাত্রে সব উপকরণ এক সাথে ভালো করে মিশিয়ে নিয়ে ১০ মিনিট ম্যারিনেটেড করে রেখে দিন শাপলাডাটাকে।
সেই ফাঁকে কলাপাতা প্রস্তুত করে নিন।চাইলে একটি বড় কলাপাতায় সমস্ত উপকরণ দিয়ে নিতে পারেন। আবার চাইলে ছোটো ছোটো করে আলাদা আলাদা ভাবেও পাতুরি করতে পারেন।কলাপাতা ভালো করে ধুয়ে শুকিয়ে নেবেন।কলাপাতাগুলি মোটামুটি মাঝারি সাইজের টুকরো করে নিন। শুকনো কলাপাতার টুকরোর দুই পিঠে সর্ষের তেল মাখিয়ে নিন। প্রতিটি টুকরো এপিঠ ওপিঠ করে আগুনে হালকা করে সেঁকে নিন।
এবার প্রতিটি কলাপাতার মধ্যে ম্যারিনেট করা শাপলাডাটা খানিকটা অংশ ভরে সুতো দিয়ে ভালো মতো বেঁধে দিন।শাপলাডাটার অংশ যাতে বেরিয়ে না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখবেন।এবার চাইলে কলাপাতা সুদ্ধ মাছ মাইক্রোওভেনে বেক করে নিতে পারেন। আবার ফ্রাইং প্যান গরম করে তাতে দুই পিঠে সেঁকেও নিতে পারেন। প্রতিটি পিঠের জন্য অন্তত পাঁচ মিনিট সময় দিতে হবে। অনেকে আবার সেঁকার সময় সামান্য তেলও দিয়ে থাকেন।তবে আমি সেঁকার সময় সামান্য সরিষার তেলে আস্ত জিরার ফোড়ন দিয়ে, তারপর মৃদু আচে পাতুরি গুলো সেঁকে নেই।গরম ভাত,পোলাও এর সাথে পরিবেশন করুন।