17/07/2026
শুক্রবার দুপুরের আজানটা কানে আসতেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে। কিচেনে চুলায় খাসির মাংসের কড়াইটা বসিয়ে দিয়েছি। মশলার ঘ্রাণে পুরো বাড়িটা ম-ম করছে।আমার মেয়েটা পাশের রুমে খেলছে, স্বামী অফিসের ছুটি, ড্রয়িংরুমে সে হয়তো খবরের কাগজ পড়ছে।
সব ঠিকঠাক, সব সাজানো তবুও এই সাজানো সংসারের মাঝে দাঁড়িয়ে কেন জানি মনে হয়, আমি কোথাও একটুখানি হারিয়ে গেছি।
জানালার দিকে তাকালাম। বাইরের আকাশটা আজ ঠিক তেমনি নীল, যেমনটা থাকতো বিয়ের আগের ওই শুক্রবারগুলোতে।
আজকের এই গুছানো দুপুরটা কি আমারই? হ্যাঁ, আমারই তো। তবুও আমার মনটা কেন জানি ঢাকা শহরের এই ফ্ল্যাটের চার দেয়াল ছাড়িয়ে বহু দূরে, আমার বাবার বাড়ির সেই বারান্দায় পড়ে আছে। বিয়ের আগের শুক্রবারগুলো ছিল অন্যরকম। তখন শুক্রবার মানেই ছিল আলসেমি আর নিখাদ আনন্দ।
আম্মা যখন মাংসের ঝোলটা কষাতেন, রান্নাঘরের সেই মশলার গন্ধে সারা বাড়ি ভরে যেত। মাংস কষে এলে আম্মা এক টুকরো আলু আর একটু ঝোল বাটিতে করে আমায় দিতেন। আর বলতেন, "যা, আব্বাকে দিয়ে আয়।" আমি দৌড়ে যেতাম আব্বার কাছে। আব্বা জুমার নামাজ পড়ে মসজিদ থেকে ফিরতেন। হাতে থাকতো একটা ঠোঙায় গরম জিলাপি। জিলাপির সেই মিষ্টি গন্ধে মিশে থাকতো আব্বার আদর আর শুক্রবারের স্নিগ্ধতা।
দুপুরের খাওয়া শেষে ওই যে একটা গাঢ় ভাতঘুম দিতাম সে ঘুমে কোনো উদ্বেগ ছিল না, কোনো দায়িত্ব ছিল না। বিকেলের রোদে আববা যখন বলতেন, "চল, একটু ঘুরে আসি," তখন মনে হতো পৃথিবীর সব সুখ বুঝি আমার হাতের মুঠোয়।
আর আজ? আজ আমি নিজেই মা হয়েছি। রান্নাঘরটা আমার, সংসারের দায়িত্বগুলো আমার। ভালোমন্দ রান্না করে খাওয়াই, বাচ্চার যত্ন নিই। সবাই বলে, "তুমি খুব গুছিয়ে সংসার করো।" আমি তখন একটা শুকনো হাসি হাসি। তারা তো আর জানে না, এই গুছিয়ে রাখা রান্নার মাঝেও আমি প্রতি শুক্রবার আমার সেই হারানো বিকেলগুলোকে খুঁজি।
এখনকার শুক্রবারগুলোতে জিলাপির মিষ্টি ঘ্রাণ নেই, আব্বার মসজিদের রাস্তা থেকে ফেরার অপেক্ষায় দরজার দিকে তাকিয়ে থাকার সুযোগ নেই। এখন সব আছে, কেবল সেই শৈশবের শুক্রবারের আকাশটা নেই।
মাংসটা কড়াই থেকে তেল ছাড়ছে। বাটিতে একটু তুলে নিলাম, কিন্তু কাউকে দেওয়ার নেই। তানিফ হয়তো বলবে, "রান্না দারুণ হয়েছে," কিন্তু আম্মার সেই হাতের ছোঁয়া কি আর পাওয়া যায়?
মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে, সব কিছু ফেলে দৌড়ে পালিয়ে যাই। আম্মার আঁচল ধরে বলি, "আম্মা, খুব ক্লান্ত লাগছে।" আব্বু যেন আবার জিলাপি নিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকে।
শুক্রবার এলেই বুকের ভেতরটা কেন জানি বড্ড খালি লাগে। সংসারটা অনেক বড়, কিন্তু নিজের জায়গাটা বড় অদ্ভুতভাবে ছোট হয়ে গেছে। কিচেনের জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবি মানুষ বড় হয়ে যাওয়া মানে কি এই শৈশবের শুক্রবারগুলোকে চিরতরে হারিয়ে ফেলা?
হয়তো তাই। আমি বড় হয়েছি, আমি ঘর সামলাচ্ছি, আমি ভালো আছি। শুধু শুক্রবারে, রান্নার ধোঁয়ার আড়ালে চোখ দুটো একটু ঝাপসা হয়ে আসে—এই আর কী।
কারূউ - Karuu