01/09/2026
আমার বাবা ছিলেন অদ্ভুত মানুষ। কথা কম বলতেন কিন্তু কথা বললে মনে হতো পৃথিবীর সবকিছু তাঁর কাছে খুব পরিষ্কার।
আমি ছোটবেলায় ছবি আঁকতাম। একদিন স্কুল থেকে ফিরে বাবাকে একটা ছবি দেখালাম। একটা নদী এঁকেছিলাম। নদীর পাশে একটা নৌকা। আকাশটা ছিল পুরো লাল। বাবা ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন,
“আকাশ লাল হয়?”
আমি বলেছিলাম,
“হয়।”
“কোথায় দেখছিস?”
“আমার ছবিতে।”
বাবা কিছু বললেন না। ছবিটা টেবিলের উপর রেখে উঠে চলে গেলেন। আমি ভেবেছিলাম, বাবা আমার ছবি পছন্দ করেননি। সেদিন রাতে মা এসে বলেছিলেন,
“তোর বাবা ছবিটা অনেকক্ষণ দেখছিল।”
“কিছু বলেছে?”
“না।”
“পছন্দ হয়েছে?”
মা হাসলেন।
“তোর বাবা পছন্দ করলেও মুখে বলে না।”
আমার বয়স যখন দশ, বাবা আমাকে প্রথমবার বাজারে নিয়ে গিয়েছিলেন। বাজারের রাস্তা পার হওয়ার সময় বাবা আমার হাত শক্ত করে ধরেছিলেন। আমি হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চেয়েছিলাম।
“বাবা, এতো শক্ত করে ধরো না।”
বাবা আরও শক্ত করে ধরেছিলেন।
“রাস্তা পার হই।”
রাস্তা পার হয়ে এপারে এসে তিনি আমার হাত ছেড়ে দিয়েছিলেন। তারপর বলেছিলেন,
“মানুষের সঙ্গে কথা বলার সময় চোখের দিকে তাকাবি।”
আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম,
“কেন?”
বাবা বলেছিলেন, “মিথ্যা বলা মানুষ চোখ সরায়।”
আমি তখন থেকেই বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার চেষ্টা করতাম। কিন্তু বাবার সঙ্গে কথা বলার সময়ই সবচেয়ে বেশি চোখ সরিয়ে নিতাম। কারণ তাঁর চোখে একটা কঠিন ভাব ছিল।
এসএসসি পরীক্ষার পর আমি ঢাকায় পড়তে যেতে চাইলাম।
বাবা বললেন,
“এখানেই কলেজে ভর্তি হ।”
আমি বললাম,
“আমি ঢাকা যাবো।”
“কেন?”
“আমার বন্ধুরা যাচ্ছে।”
“বন্ধুরা কি তোর জীবন চালাবে?”
“না।”
“তাহলে?”
আমি প্রথমবার বাবার সঙ্গে তর্ক করলাম।
“আমি নিজের জীবন নিজে চালাবো।”
বাবা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর বললেন,
“ঠিক আছে।”
এই ’ঠিক আছে’ কথাটার মধ্যে কী ছিল আমি ঐ বয়সে বুঝিনি।
পরদিন তিনি আমাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দিলেন। কোনো বিদায় দিলেন না। শুধু বাস ছাড়ার আগে বললেন,
“টাকা শেষ হওয়ার আগে জানাস।”
আমি বললাম,
“লাগবে না।”
বাবা বললেন,
“জানাস।”
বাস ছাড়ার পর জানালার পাশে বসে দেখেছিলাম, বাবা এখনও রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি একটা হাত উঁচু করেছিলেন, আমি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম।
ঢাকায় এসে বুঝলাম স্বাধীনতা খুব সুন্দর জিনিস নয়। স্বাধীনতার ভাড়া আছে। বিদ্যুতের বিল আছে। ক্ষুধা আছে। অসুখ আছে। একাকীত্ব আছে। মাসের শেষে বাবার পাঠানো টাকা নিতে আমার খুব খারাপ লাগতো। একদিন ফোন করে বললাম,
“আর টাকা পাঠিও না।”
বাবা বললেন,
“কেন?”
“আমি নিজে পারবো।”
“কী করিস?”
“টিউশনি।”
“পড়াশোনা?”
“হয়।”
“খাওয়া হয়?”
আমি বিরক্ত হয়ে বলেছিলাম,
“বাবা, এসব জিজ্ঞেস কইরো না।”
ওপাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর বাবা বলেছিলেন,
“ঠিক আছে।”
ফোন কেটে দিয়েছিলাম। সেই রাতে আমার খুব খারাপ লেগেছিল। কিন্তু ফোন করিনি।
তারপর অনেক বছর কেটে গেছে।
লেখাপড়া শেষ করে চাকরি পেলাম। ঢাকায় থাকলাম। বিয়ে করলাম। সন্তান হলো। বাবা মা গ্রামেই রইলেন। মাঝে মাঝে যেতাম। বাবা আমার ছেলেকে কোলে নিয়ে বসতেন। ছেলেটা তাঁর গোঁফ টানতো। বাবা হাসতেন। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। এই মানুষটা হাসতে পারে?
একদিন আমার ছেলে একটা ছবি এঁকে বাবাকে দেখালো। একটা নদীর। নদীর পাশে নৌকা। আর আকাশটা পুরো লাল।
বাবা ছবিটা দেখে বললেন,
“খুব সুন্দর হয়েছে।”
আমি চমকে উঠে তাঁর দিকে তাকালাম। বাবা আমাকে দেখলেন না। শুধু ছবিটার দিকে তাকিয়ে ছিলেন।
মা মারা গেলেন শীতের এক সকালে। বাবা খুব শান্ত ছিলেন।
কেউ কাঁদলে বলতেন,
“কাঁদিস না।”
নিজেও কাঁদেননি।
মায়ের দাফনের পর সন্ধ্যায় আমি বাবার পাশে বসেছিলাম। অনেক বছর পর এত কাছে।
তিনি বললেন,
“তোর মা তোকে নিয়ে খুব চিন্তা করতো।”
আমি বললাম,
“জানি।”
“তুই খাওয়া ঠিকমতো খাস না।”
আমি বললাম,
“এখনও?”
বাবা বললেন,
“বাপ মায়ের কাছে ছেলের বয়স বাড়ে না।”
আমি সেদিন প্রথমবার বাবার হাত ধরতে চেয়েছিলাম। পারিনি। আমার হাতটা মাঝপথে থেমে গিয়েছিল। বাবা টের পেয়েছিলেন কি না জানি না।
মায়ের মৃত্যুর পর বাবা ঢাকায় আমার কাছে চলে এলেন। আমার স্ত্রী তাঁর জন্য আলাদা ঘর করে দিলো। বাবা খুব অস্বস্তিতে থাকতেন। একদিন বললেন,
“আমি এখানে থাকলে তোদের কষ্ট হয়।”
আমি বললাম,
“কী যে বলেন!”
কিন্তু সত্যি বলতে, কষ্ট হতো। বাবার ওষুধ। ডাক্তার। খাবার। রাতে উঠে দেখা। আমার অফিস। ছেলের স্কুল। স্ত্রীর কাজ। জীবন খুব ছোট হয়ে গিয়েছিল। এক রাতে বাবা পানি চাইলেন। আমি তখন খুব ক্লান্ত। পানি দিয়ে এসে একটু বিরক্ত হয়ে বলেছিলাম,
“বাবা, উঠে গিয়ে পানিটা নিতে পারো না?”
বাবা চুপ করে গেলেন। আমি ঘরে চলে এলাম। পরদিন সকালে তাঁর দরজা খুলে দেখি, তিনি বিছানায় বসে আছেন।
বললেন,
“আজ থেকে তোকে আর ডাকবো না।”
আমি হেসে বললাম,
“এই জন্য রাগ করছো?”
তিনি বললেন,
“না।”
“তাহলে?”
“তুই ক্লান্ত থাকিস।”
আমি বললাম,
“আমি ঠিক আছি।”
তিনি বললেন,
“তুই ছোটবেলায়ও এই কথা বলতি।”
সেদিন রাতে বাবা আমাকে ডাকেননি। পরদিনও না। তৃতীয় দিনও না। চতুর্থ দিন সকালে তাঁর ঘরে গিয়ে দেখি তিনি জানালার দিকে তাকিয়ে আছেন। বললাম,
“কী দেখো?”
“কিছু না।”
“চা দেবো?”
“দে।”
আমি চা বানাতে গেলাম। চায়ের কাপ নিয়ে এসে তাঁর সামনে রাখলাম। তিনি কাপটা হাতে নিয়ে বললেন,
“তুই ছোটবেলায় চা বানাতে পারতি না।”
আমি হেসে বললাম,
“এখন পারি।”
বাবা বললেন,
“হুম।”
তারপর চা খেলেন। আমিও বসে রইলাম। আমাদের মধ্যে অনেক কথা ছিল। কেউ বললাম না।
এর কিছুদিন পর আমি অফিসের কাজে সিঙ্গাপুর গেলাম।
বাবা যাওয়ার আগে বললেন,
“কতদিন?”
“দশ দিন।”
“ফিরবি কবে?”
“দশ দিন পর।”
“ঠিক আছে।”
বিমানবন্দরে যাওয়ার সময় বাবা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি গাড়িতে উঠে পড়লাম। পেছনের আয়নায় দেখলাম, বাবা এখনও দাঁড়িয়ে আছেন। হঠাৎ মনে হলো, নেমে যাই। একবার জড়িয়ে ধরি। কিন্তু গাড়ি ততক্ষণে ছেড়ে দিয়েছে। আমি ভাবলাম, ফিরে এসে ধরবো।
আমি ফিরেছিলাম। কিন্তু বাবা তখন আর কথা বলতে পারতেন না। স্ট্রোক হয়েছিল। হাসপাতালে ছুটে গেলাম। বাবা আমাকে দেখে চোখ খুললেন। আমি তাঁর হাত ধরলাম। অনেক বছর পর। এবার আর হাত মাঝপথে থামেনি।
আমি ডাকলাম,
“বাবা।”
তিনি তাকালেন।
আমি তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
এই প্রথমবার এতক্ষণ তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারলাম।
আমি বললাম,
“রাগ করো না।”
তিনি কিছু বলতে পারলেন না।
আমি বললাম,
“আমি ছোটবেলায় তোমাকে খুব ভয় পেতাম।”
তাঁর চোখে পানি এলো।
তিনি চোখ বন্ধ করলেন। আমি বুঝতে পারলাম না, তিনি কষ্ট পেয়েছেন, নাকি আমাকে ক্ষমা করেছেন। হয়তো দুটোই।
বাবা সাতদিন পর মারা গেলেন। শেষ দিন তাঁর পাশে আমি ছিলাম। তিনি তখন প্রায় অচেতন। আমি তাঁর হাত ধরে বসেছিলাম। মনে হচ্ছিল, এই হাতটাই ছোটবেলায় আমাকে রাস্তা পার করিয়েছিল। এই হাতটাই আমার স্কুলের ফি দিয়েছিল। এই হাতটাই আমাকে প্রথম সাইকেল চালানো শিখিয়েছিল। এই হাতটাই আমাকে ঢাকায় পাঠিয়েছিল। এই হাতটাই আমার ছেলের মাথায় হাত রেখেছিল।
বাবার মৃত্যুর পর আমি তাঁর ঘরে একা বসেছিলাম। ঘরটা খুব সাধারণ। একটা বিছানা। একটা জানালা। একটা চেয়ার। দেয়ালে কিছুই নেই। আমি চেয়ারে বসে বাবার কথা ভাবছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, বাবার সঙ্গে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখটা কী?
তিনি মারা গেছেন?
না।
আমি তাঁকে শেষবার জড়িয়ে ধরতে পারিনি?
না।
আমি তাঁকে যথেষ্ট সময় দিইনি?
তাও না।
সবচেয়ে বড় দুঃখ হলো, আমি যখন তাঁর কাছে ছিলাম, তখন তাঁকে বুঝিনি।
বছর তিনেক পর আমার ছেলে কলেজে ভর্তি হলো।
একদিন সে এসে বললো,
“বাবা, আমি অন্য শহরে থাকতে চাই।”
আমার বুকের ভেতর হঠাৎ কেমন করে উঠলো।
আমি বলতে চাইলাম,
“না, এখানেই থাক।”
কিন্তু বাবার কথা মনে পড়লো।
আমি বললাম,
“যা।”
ছেলে অবাক হয়ে তাকালো।
“সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
“তুমি রাগ করছো না?”
আমি বললাম,
“না।”
সে চলে যাওয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়ালো। আমি তাকে ডাকলাম।
সে ফিরে তাকালো।
আমি বললাম,
“টাকা শেষ হওয়ার আগে জানাস।”
ছেলেটা হাসলো।
“আব্বা, আমি নিজে পারবো।”
আমি কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
তারপর বললাম,
“জানি।”
সে চলে গেল।
দরজা বন্ধ হওয়ার পর আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম।
আমার বুকটা খালি খালি লাগছিল।
একদিন আমার ছেলে আমাকে ফোন করলো।
“বাবা?”
“হুম।”
“তুমি কী করছো?”
আমি বললাম,
“কিছু না।”
সে বললো,
“বাবা, একটা কথা বলবো?”
“বল।”
“তুমি ছোটবেলায় আমাকে নিয়ে খুব কঠিন ছিলে।”
আমি চুপ করে গেলাম।
“আমি জানি।”
সে বললো,
“কিন্তু এখন বুঝি।”
“কী?”
“তুমি ভয় পেতে।”
আমি অবাক হলাম।
“কীসের?”
“আমাকে হারানোর।”
আমি আর কথা বলতে পারলাম না।
সেদিন রাতে আমি বাবার কথা খুব মনে করলাম। কোনো বিশেষ স্মৃতি নয়। কোনো বড় ঘটনা নয়। শুধু একটা দৃশ্য। বহু বছর আগের। আমি ঢাকায় যাওয়ার জন্য বাসে উঠেছি। বাবা নিচে দাঁড়িয়ে। আমি জানালার পাশে বসেছি। বাস ছাড়ছে। বাবা কিছু একটা বলতে চেয়েছিলেন। বলতে পারেননি। শুধু একটা হাত উঁচু করেছিলেন। আমি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম। হয়তো তিনি বলতে চেয়েছিলেন, “ভয় পাস না। আমি আছি।”
এখন আমার বয়স পঁয়ষট্টি। আমার ছেলে বিদেশে। মেয়ে অন্য শহরে। বাড়িতে আমি আর আমার স্ত্রী। একদিন সন্ধ্যায় আমার নাতি এসে আমাকে একটা ছবি দেখালো। সে একটা মানুষ এঁকেছে। মানুষটার হাত দুটো অনেক বড়। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“এটা কে?”
সে বললো,
“তুমি।”
“আমার হাত এত বড় কেন?”
সে বললো,
“এই হাতে ধরে তুমি আমাকে রাস্তা পার করে দিবে।”
আমি ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর হঠাৎ আমার বাবার কথা মনে পড়লো। আমি নাতিটাকে কাছে টেনে তার হাত ধরলাম। সে বললো,
“দাদু, এত জোরে ধরো না।”
আমি সঙ্গে সঙ্গে হাত ছেড়ে দিলাম।
সে আমার হাতটা আবার ধরে বললো,
“না, ধরো।”
আমি তার হাত ধরলাম। খুব আস্তে। তার ছোট্ট হাতটা আমার বৃদ্ধ হাতের মধ্যে। আমি জানি না কেন, চোখে পানি চলে এলো। নাতি জিজ্ঞেস করলো,
“দাদু, তুমি কাঁদছো?”
আমি বললাম,
“না।”
সে বললো,
“তাহলে?”
আমি তার মাথায় হাত রেখে বললাম,
“কিছু না।”
অনেক দূরে কোথাও আজানের শব্দ উঠেছিল। সন্ধ্যা আরও গাঢ় হচ্ছিল। আমার মনে হলো,মানুষ আসলে কোনোদিন পুরোপুরি তার বাবাকে বিদায় দিতে পারে না। বাবা মারা যান।
তারপরও তিনি থেকে যান,সন্তানের হাত ধরার ভঙ্গিতে, রাগের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ভয়ে, অকারণে জিজ্ঞেস করা, “খেয়েছিস?” প্রশ্নে, আর সেই অদ্ভুত অভ্যাসে, যেখানে আমরা নিজের সন্তানকে দূরে পাঠানোর সময় খুব আস্তে করে বলি, “ভয় পাস না। আমি আছি।”
কিন্তু সে শুনতেই পায় না!
আমরা অনেক সময় বাবা-মায়ের ভালোবাসা বুঝতে পারি তখন, যখন তাঁদের ভালোবাসার মানুষ হয়ে ওঠার বয়স আমাদের হয়ে যায়—কিন্তু তখন হয়তো তাঁদের কাছে ফিরে গিয়ে “আমি বুঝেছি” বলার সুযোগটা আর থাকে না।🌸