17/08/2026
শাহেনশাহ-ই-কাওয়ালি: সুরের আকাশে এক নক্ষত্রের মহাপ্রয়াণ
উস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলী খান—কেবল একটি নাম নন; তিনি ছিলেন এক স্বর্গীয় কণ্ঠের মহাকাব্য। তাঁর কণ্ঠে কাওয়ালি যেন সুরের সীমা পেরিয়ে আত্মার ভাষায় পরিণত হয়েছিল। প্রায় ছয় শতাব্দীর পারিবারিক কাওয়ালি ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে তিনি সুফি সংগীতকে পৌঁছে দিয়েছিলেন বিশ্বমঞ্চের সর্বোচ্চ শিখরে। ১৯৯৭ সালের ১৬ আগস্ট, মাত্র ৪৮ বছর বয়সে যখন তাঁর জীবনপ্রদীপ নিভে যায়, তখন যেন থমকে গিয়েছিল বিশ্বসংগীতের এক বিশাল অধ্যায়। কিন্তু মানুষটি চলে গেলেও তাঁর রেখে যাওয়া সুরের সাম্রাজ্য আজও কোটি মানুষের হৃদয়ে অমলিন।
১৯৪৮ সালের ১৩ অক্টোবর পাকিস্তানের ফয়সালাবাদে এক ঐতিহ্যবাহী কাওয়াল পরিবারে জন্ম নেন নুসরাত ফতেহ আলী খান। তাঁর পরিবার প্রায় ছয় শতাব্দী ধরে কাওয়ালির সুফি ঐতিহ্যকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করে আসছিল। খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (র.)-এর আজমীর শরীফের আধ্যাত্মিক পরিবেশ এবং আমীর খসরুর মাধ্যমে বিকশিত উপমহাদেশীয় কাওয়ালি ঐতিহ্যের সেই দীর্ঘ ধারাই ছিল তাঁর সংগীতজীবনের অন্যতম ভিত্তি।
তাঁর বাবা উস্তাদ ফতেহ আলী খান চেয়েছিলেন, ছেলে ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করুক। কিন্তু নিয়তির লিখন ছিল অন্যরকম। ১৯৬৪ সালে পিতার ইন্তেকালের পর নুসরাত এক বিস্ময়কর স্বপ্ন দেখেন। স্বপ্নে তাঁর বাবা তাঁকে একটি পবিত্র দরগাহে নিয়ে গিয়ে কাওয়ালি গাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন। স্বপ্নের সেই দরগাহর বর্ণনা শুনে তাঁর চাচারা বুঝতে পারেন, তিনি যেন আজমীর শরীফের পবিত্র দরগাহরই কথা বলছেন—যেখানে তিনি তখনও কখনো যাননি। পিতার মৃত্যুর চল্লিশতম দিনে প্রথমবার জনসমক্ষে কাওয়ালি পরিবেশনের মধ্য দিয়েই শুরু হয় তাঁর শিল্পীজীবনের নতুন অধ্যায়।
১৯৭১ সালে তিনি পারিবারিক কাওয়ালি দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এরপর তাঁর কণ্ঠ, পরিবেশনার ধরন এবং আধ্যাত্মিক আবেগ তাঁকে খুব দ্রুত স্বতন্ত্র উচ্চতায় নিয়ে যায়। তাঁর গায়কিতে ছিল এমন এক মগ্নতা, যা কেবল সংগীতের সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ থাকত না; বরং শ্রোতাকে নিয়ে যেত গভীর অনুভূতির এক জগতে। চোখ বন্ধ করে, হাত তুলে, আল্লাহর প্রেম ও স্মরণে নিমগ্ন হয়ে তাঁর কাওয়ালি পরিবেশন যেন এক রুহানি আবেশ সৃষ্টি করত।
নুসরাত ফতেহ আলী খানের আধ্যাত্মিক জীবনের সঙ্গেও চিশতিয়া সুফি ঐতিহ্যের গভীর সম্পর্ক ছিল। পীর নাসেরুদ্দিন নাসের (গোলেড়া শরীফ)-এর আধ্যাত্মিক সাহচর্য ও মরমি কালাম তাঁর কণ্ঠের প্রকাশভঙ্গিতে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল। পীর-মাশায়েখের প্রতি তাঁর ভক্তি এবং সুফি ভাবধারার প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁর কাওয়ালিকে দিয়েছিল এক বিশেষ রুহানি আবহ। তাঁর কণ্ঠে প্রেম, বিরহ, আকুতি ও স্রষ্টার প্রতি আত্মসমর্পণের অনুভূতি যেন একই সুরের ধারায় মিলেমিশে যেত।
তবে নুসরাত শুধু ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হয়ে থেমে থাকেননি; তিনি ছিলেন এক অসাধারণ উদ্ভাবকও। প্রথাগত কাওয়ালির দীর্ঘ পরিবেশনাকে তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত ও গতিশীল করে তিনি সমকালীন শ্রোতাদের কাছে তা আরও সহজে পৌঁছে দেন। দ্রুত লয়, অনন্য সরগম, দীর্ঘ আলাপ এবং মুহূর্তের মধ্যে স্বরের বিস্ময়কর ওঠানামা তাঁর গায়কির স্বাক্ষরে পরিণত হয়। তাঁর কণ্ঠের বিস্তৃত পরিসর এবং দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চমাত্রার স্বর ধরে রাখার ক্ষমতা তাঁকে সমসাময়িক শিল্পীদের থেকে আলাদা করে দিয়েছিল।
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এই মেলবন্ধনই নুসরাতের কাওয়ালিকে বিশ্বমঞ্চে নতুন পরিচয় দেয়। প্রথাগত বাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি সিন্থেসাইজার, ড্রাম ও অন্যান্য আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার তাঁর সংগীতকে নতুন মাত্রা দেয়। শুরুতে রক্ষণশীল মহলের কেউ কেউ তাঁর এই পরিবর্তনের সমালোচনা করলেও সময় প্রমাণ করে—তিনি কাওয়ালির আত্মাকে বিসর্জন দেননি; বরং নতুন সময়ের শ্রোতার কাছে সেই আত্মিক বাণী পৌঁছে দেওয়ার জন্য নতুন পথ তৈরি করেছিলেন।
আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতি দ্রুত বিস্তৃত হতে থাকে। ব্রিটিশ সংগীতশিল্পী পিটার গ্যাব্রিয়েল এবং তাঁর রিয়েল ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নুসরাতের কণ্ঠকে পশ্চিমা বিশ্বের বৃহত্তর শ্রোতামহলে পৌঁছে দেয়। ১৯৮৮ সালে মার্টিন স্করসেসির The Last Temptation of Christ চলচ্চিত্রের সাউন্ডট্র্যাকে তাঁর সংগীত ব্যবহৃত হয়। পরবর্তীতে Natural Born Killers সহ আরও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে তাঁর কণ্ঠ ও সংগীতের উপস্থিতি বিশ্বসংগীতের পরিসরে তাঁর অবস্থান আরও দৃঢ় করে।
তিনি কেবল পাকিস্তান কিংবা উপমহাদেশের শিল্পী ছিলেন না; তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনের এক অনন্য প্রতীক। তাঁর কাওয়ালি ভাষা, ধর্ম ও ভূগোলের সীমারেখা অতিক্রম করে পৌঁছে যায় মেলবোর্ন, লন্ডন, নিউ ইয়র্কসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে। ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষও তাঁর কণ্ঠে এমন এক আবেগ খুঁজে পেত, যার ভাষা আলাদা করে বোঝার প্রয়োজন হতো না—অনুভব করাই যথেষ্ট ছিল।
তাঁর অসাধারণ কর্মজীবনের স্বীকৃতিও এসেছে নানা আন্তর্জাতিক পরিসর থেকে। তাঁর বিপুলসংখ্যক কাওয়ালি রেকর্ডিং তাঁকে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে স্থান করে দেয়। UNESCO Music Prize এবং পাকিস্তানের সম্মানজনক Pride of Performance পুরস্কারসহ বিভিন্ন স্বীকৃতি তাঁর শিল্পীসত্তার আন্তর্জাতিক মর্যাদাকে আরও প্রতিষ্ঠিত করে। পশ্চিমা সংগীতজগতের বহু শিল্পীও তাঁর প্রতিভায় গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। মার্কিন সংগীতশিল্পী জেফ বাকলি তাঁকে নিজের ‘এলভিস প্রিসলি’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন—যা নুসরাতের বিশ্বসংগীতে প্রভাবেরই এক অনন্য স্বীকৃতি।
১৯৭৯ সালে নুসরাত প্রথমবার সশরীরে আজমীর শরীফে যান। তাঁর শৈশবের সেই স্বপ্নে দেখা পবিত্র দরগাহর সঙ্গে এই বাস্তব সাক্ষাৎ তাঁর আধ্যাত্মিক জীবনের এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকে। খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (র.)-এর দরবারের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা তাঁর কাওয়ালির ভাবজগতেও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
তাঁর গাওয়া অসংখ্য কালজয়ী কালাম আজও মানুষের হৃদয়ে অনুরণিত হয়—‘আল্লাহ হু’, ‘ওহি খুদা হ্যায়’, ‘তুমে দিল্লগি ভুল জানি পড়েগি’, ‘ইয়ে জো হালকা হালকা সুরুর হ্যায়’, ‘সানু এক পাল চেইন না আভে’, ‘মেরা পিয়া ঘর আয়া’ কিংবা ‘দম মস্ত কালান্দার’। প্রতিটি পরিবেশন যেন তাঁর কণ্ঠে নতুন এক জীবন লাভ করেছে। তাঁর গায়কিতে প্রেম কখনো মানবিক, কখনো মরমি; বিরহ কখনো প্রিয়জনের, আবার কখনো পরম প্রিয়তমের সন্ধানের আকুতি।
১৯৯৭ সালের আগস্টে নুসরাত ফতেহ আলী খান গুরুতর শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য পাকিস্তান থেকে লন্ডনে যাওয়ার পর তাঁকে জরুরি ভিত্তিতে ক্রোমওয়েল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার মধ্যে তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটছিল। অবশেষে ১৬ আগস্ট হাসপাতালে তাঁর হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টাও তাঁকে আর ফিরিয়ে আনতে পারেনি। মাত্র ৪৮ বছর বয়সে পৃথিবীর মঞ্চ থেকে বিদায় নেন কাওয়ালির সেই মহাসম্রাট।
তাঁর প্রয়াণ ছিল বিশ্বসংগীতের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর কণ্ঠের সেই আকাশে আজও সুর জেগে ওঠে, তিনি তাঁর সুরের মধ্যেই অমর হয়ে আছেন।
তথ্যসূত্র
১. EBSCO Research Starters — Nusrat Fateh Ali Khan
২. The Daily Star — Remembering the Heavenly Harmonies of Nusrat Fateh Ali Khan
৩. The Nation — Nusrat Fateh Ali Khan’s Voice From the Past
৪. Guinness World Records — Most Recordings by a Qawaali Artist
৫. Journal of the Pakistan Medical Association
৬. Le Messager du Qawwali — Pierre-Alain Baud
৭. Nusrat Fateh Ali Khan: Qawali Ka Payam Rasan — Shaukat Niazi
সংকলন ও সম্পাদনা : Gulshan-e-Chishty