22/04/2026
যে ছেলেটি বড় মাছটা কাটছে তার ভেতরে অদ্ভুত ও বাস্তব দর্শন পেলাম। তার সামনে থাকা ছেলেকে বারবার ধমক দিচ্ছে। তুই মাছ কাটা ছাড় রে ভাই। তুই অনেক ছোট। পড়াশোনা কর।
বললাম, তুমিওতো অনেক ছোট। পড়াশোনা করছো না। বলল, ভাই জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করেছি পড়াশোনা না করে। এই যে মাছ কাটি এটাতে আমার ভালো ইনকাম হয় সত্য। আমি এই কামে না এলে বাবা মাকে সাহায্য করতে পারতাম না। তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে বাধ্য হয়ে এই কাজে নামছি। এক হিসেবে এটা ভুলও না। কারণ আমি কাজ না করলে তাদেরকে কে দেখতো। কিন্তু আমার উচিত ছিল পাশাপাশি পড়াটা চালিয়ে যাওয়া।
এজন্যই এই ছেলেটারে রোজ বলি পড়তে।
বললাম, অসুবিধা কী। সেওতো টাকা আয় করছে। এই বয়সে দিনে তিন চারশ টাকা কম কিসে।
বলল, নিজের জীবনটাকে বদলানো উচিত।
বললাম, আরে পড়াশোনা করেতো ওই টাকার পেছনেই দৌড়াবে নাকি!
বলল, ভাই টাকাই যদি সব হইতো তাইলেতো চু রি করে অন্যায় করেও কামাই করা যাইতো।
কথা ঠিক।
তা কেন পড়াশোনা করবে সে?
বলল, এই রাস্তায় এক জায়গায় থেকে ওর চিন্তাও এইটুকুই থাকবেতো। পড়াশোনা করলে চিন্তাভাবনা বদলাবে, মানুষ হবে। ভাশাজ্ঞান ঠিক হবে। ভবিষ্যত বদলাবে। টাকা পয়সা যাই ইনকাম করুক একটু ভালো পরিবেশতো হইতো নাকি। সবচেয়ে বড় কথা ভাই, মানুষ হইতো ভালোভাবে। ভালো মন্দ বুঝতো। দুনিয়াডাও বুঝতো।
কী দার্শনিক কথারে বাবা।
বললাম, ও আচ্ছা বড়বড় ডিগ্রি নিতো গাড়িতে চরতো তাইনা?
ছেলেটা মাছ কাটা থামিয়ে বলল, ভাইরে ডিগ্রি গাড়ি বাড়ি সবারই আছে। মানুষ হয় কয়জন। যারা ডিগ্রি নিছে তাগো সবাই কি আর মানুষ হইছে!
আমার খুব সন্দেহ হলো এই ছেলেটার কথায়।
ভাই তুমি যে সব কথা বলছো তা তো তোমার পক্ষে বলা সম্ভব না। আচ্ছা আচ্ছা পড়াশোনা করা মানুষও বলে না।
ছেলেটা হেসে বলল, যা কন না কেন ভাই ওই পিচ্চিরে বলেন পড়তে। এইভাবে হাল ছেড়ে এক কামে থাকা ঠিক না।
ছেলেটাকে শেষ প্রশ্ন করলাম। আচ্ছা তুমি যদি পড়াশোনা করে এই কাজ করতা! বলল, তাতেও অসুবিধা নাই। অন্তত কতকিছু জানতে পারতাম! কাজতো ছোট না।
বুঝতে পারলাম এই ছেলে আসলে আমাদের বাস্তবতাকে বুঝাতে চাইছে। আমরা অধিকাংশই ভাবি পড়াশোনা মানেই বড় চাকরি, গাড়ি বাড়ি হাই স্ট্যাটাস।
কিন্তু এ আসলে বুঝাতে চাইছে পড়াশোনা মানে নিজের ভেতরটাকে সুন্দর করা। পরিবেশটাকে বদলানো আর সে সাথে মার্জিত আরো সম্মানজনক কিছু করা। যেন পরের জীবনটা আরো চমৎকার হয়। ছেলেটা হয়তো এমন কিছুই বুঝাচ্ছে।
মাছ নিয়ে চলে আসবো। ডেকে বলল, এই যে দেখেন এই রিকশাওয়ালাডা কী আখাইস্তা ভাষায় গালি দিল।
আর ওই যে প্রাইভেট কারে থাকা লোক ওই লোককেও চিনি। ওই লোক অনেক বড় চাকরি করে। কিন্তু দেখেন রিকশাওয়ালারে তুই বলে ডাকছে। অথচ রিকশাওয়ালার বয়স তার চাইতেও বেশি।
ওই যে দেখেন আরেক অফিসার। শুনছি ঘুষ খায়। রোজ এইখানে বড় বড় মাছ কিনে।
এই তিন জনের একজনও আসলে আসল শিক্ষিত না। যদি আসলেই শিক্ষিত হইতো কেউ এমন করতো না। রিকশাওয়ালারও পড়াশোনা নাই তাই মা তুলে গালি দিল। চারচাকাওয়ালারও পড়াশোনা নাই তাই তুমি কইলো।
বললাম, তাইলে ওই মাছ কেনা অফিসারের?
বলল, হের তো আরো পড়াশোনা নাই। খালি সার্টিফিকেট নিছে। পড়াশোনার মতো পড়াশোনা করে জ্ঞানী হইলে ঘুষ খেয়ে অন্যেরে ঠকাইতো, হারাম খাইতো?
আমি দ্রুত মাছ নিয়ে বাসায় ফিরলাম। এই ছেলেটা আমার মাথা এলোমেলো করে দিছে। আমি নিজেও কিছু বড় ডিগ্রিধারী। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, আমি আসলে শিক্ষিত হইনি। আমার আচরণ বদলায়নি, চিন্তা বদলায়নি, ভাষা বদলায়নি।
আমার আসল শিক্ষিত মানুষ হতে ইচ্ছে করছে আজ খুব খুব খুব....