14/01/2021
সাহিত্যের জগতে এমন অনেক চরিত্র আছে যারা বছরের পর বছর ধরে প্রত্যেকটা জেনারেশনের মাথায় গেঁথে থাকে, যাদের ভালো না বেসে উপায় নেই, যাদের নিয়ে না ভেবে উপায় নেই। তবে আমার সন্দেহ, জে.কে.রাউলিং এর মতোন করে "সেভেরাস স্নেইপের" এমন রহস্যময় চরিত্র আর কখনো কেউ তৈরি করতে পেরেছে কিনা!
আপনারা স্নেইপ সম্পর্কে প্রায় সবই জানেন, সেভাবে জানানোর কিছু নেই তবে তাকে নিয়ে আমার কিছু কথা বা অনুভূতি শেয়ার করবো।
চরিত্রের প্লট তৈরিঃ
গল্পকে আকর্ষনীয় করে তোলার জন্য প্লট টুইস্ট জরুরী। যেকোন প্লট টুইস্টের ক্ষেত্রে, গল্পের প্রয়োজনে কোন চরিত্রকে ভালো থেকে খারাপ কিংবা খারাপ থেকে ভালো বানিয়ে দেয়া হয়।
জে.কে.রাউলিং হ্যারী পটার সিরিজে "সেভারেস স্নেইপ" এর চরিত্রের মাধ্যমে সবচেয়ে বড় প্লট টুইস্টই দিয়েছেন পাঠক/দর্শকদের, তবে সেটা করেছেন তার নিজস্ব বুদ্ধিদ্বীপ্ত উপায়ে।
হ্যারী পটার সিরিজের ৭ টি বইয়ের একদম প্রথম থেকেই পুরোটা সময় জুড়ে "সেভারেস স্নেইপ" এর চরিত্রটি ছিল ইতিবাচক, যা কিনা আমরা শেষ পার্টের আগ পর্যন্ত বুঝতেই পারি নি, আর এখানেই "সেভারেস স্নেইপ" চরিত্রটি তার স্বার্থকতা পেয়েছে।
এই সিরিজে হ্যারীই ছিল কেন্দ্রীয় চরিত্র যার দরুন আমরা হ্যারীর ভালো লাগা কে ভালো ভাবে নিয়েছি, তার খারাপ লাগা কে খারাপ ভাবে নিয়েছি, তার শত্রুকে শত্রু ভেবেছি এবং বন্ধুকে বন্ধু ভেবেছি। তাই হ্যারীর চোখে অতিরিক্ত কঠোর, রুক্ষভাষী, সবসময় নিচু দেখানো, সন্দেহভাজন স্নেইপ এর জায়গাটাও আমাদের চোখে একই রকম ছিল।
কিন্তু জে.কে.রাউলিং প্রথম থেকেই ছোট্ট ছোট্ট কিছু ক্লু রেখে গিয়েছিলেন পাঠক/ দর্শকদের জন্য। এই যেমন ধরুন, ব্রুম স্টিক দূর্ঘটনা থেকে হ্যারীকে বাঁচানোর জন্য কুইডিচ ম্যাচে সাহায্য করা, মিসেস নরিসের প্যাট্রিফাইড হয়ে যাওয়ার পর হ্যারি এবং তার বন্ধুদের দোষরোপ করা হলে স্নেইপ এর প্রটেক্টিভ হয়ে যাওয়া, প্রফেসর আমব্রিডজ যখন হ্যারিকে প্রশ্ন করতে চায় তখন তাকে ভুল Veritaserum potion দেওয়া। এমন অসংখ্যবার স্নেইপ আড়ালে থেকে হ্যারীকে সাহায্য করে গেছে। মূলত হ্যারীর লক্ষ্য পূরণের আসল চাবিকাঠিই ছিল প্রফেসর স্নেইপ।
তবে শেষ পার্টের আগ পর্যন্ত আমরা এই সব ঘটনাগুলোই সন্দেহের চোখে নিয়েছি। খেয়াল করি নি যে, ডাম্বলডোরের অফিসের সম্পুর্ন স্বাধীন প্রবেশাধিকার থাকা স্বত্তেও স্নেইপ কখনো ডাম্বল্ডোরের পোট্রের্ট বা পেনসিভ এর মতোন মূল্যবান জিনিসগুলো ভল্ডেমর্ট এর হাতে পরতে দেয় নি। আরও খেয়াল করি নি যে, সে তার স্টুডেন্টদের প্রতি কতোটা রক্ষণশীল ছিল।
লেখিকা খুব সাবধানে, খুব চতুরতার সাথে এই চরিত্রটিকে মোক্ষম সময় পর্যন্ত আড়াল করে গেছেন। ডাম্বলডোরের মৃত্যুর মাধ্যমে যখন স্নেইপ আমাদের সবার চোখে সর্বোচ্চ নেতিবাচক পর্যায়ে পৌঁছে যায় , ঠিক তখনই হুট করে পুরো ১৮০° কোণে ঘটনাগুলোর পারিপার্শ্বিকতা পরিবর্তন করে দেয়া হয়। এরপরই আমাদের সামনে প্রফেসর স্নেইপের রহস্যময় চরিত্রটির রহস্য এক এক করে উন্মোচন করা হয়। ওই ছোট্ট ছোট্ট ক্লু বা পাজলকে একত্রিত করে একটা রূপ দেয়া হয়। আমরা তখন আসল ধাক্কাটা পাই, কি অসাধারণভাবে কোন চরিত্রের পাজল এভাবে লুকিয়ে রাখা যায় তা জে.কে.রাউলিং ঠিকই আমাদের দেখিয়ে দিয়েছেন। পাঠক/দর্শকরা এক মনস্তাত্ত্বিক খেলারই অংশ হয়েছিল পুরোটা সিরিজ জুড়ে।
চরিত্রের পরিচিতিঃ
সেভারেস স্নেইপ, মাগল(জাদু না জানা ব্যক্তি) বাবা টবিয়াস স্নেইপ এবং জাদুকর(উইচ) মা আইলিন প্রিন্স এর সন্তান, ১৯৬০ সালের ৯ জানুয়ারী স্পিনার্স এন্ডে জন্ম। ছোট্ট বেলা থেকে পারিবারিক কলহ দেখে বড় হওয়া ছেলেটা সবসময় ভাবতো কবে এই কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তার প্রিয় হগওয়ার্টসে যাবে।
হগওয়ার্টসে যাওয়ার আগে বন্ধুহীন স্নেইপের জীবনে অসাধারণ একজন বন্ধু এসেছিল লিলি ইভান্সের রূপ নিয়ে। বন্ধুর ম্যাজিক্যাল পাওয়ার দেখে, তাকে সাথে নিয়েই হগওয়ার্টসে যাওয়ার পরিকল্পনা করে সে। একমাত্র বন্ধুকে আঁকড়ে ধরেই স্নেইপ তার সুখ খুঁজে নিয়েছিল।
ছোট্ট বেলা থেকে মেধাবী এবং পরিশ্রমী ছাত্রটি স্লিদারিন হাউজে জায়গা করে নেয়। মায়ের উপর বাবার অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে মাগলদের প্রতি জন্মানো ঘৃণা, ডার্ক ম্যাজিকের প্রতি আকর্ষন আর সবসময় হীনমন্যতায় ভোগা ছেলেটার স্পেশাল হতে চাওয়াই স্লিদারিনে জায়গা করে নেয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করেছে।
অন্যদিকে লিলির জায়গা হয় গ্রিফিন্ডর হাউজে।
বিভিন্নভাবে বুলিইং এর স্বীকার হলেও ভালোই চলছিল স্নেইপের শিক্ষাজীবন, সে এতোটাই মেধাবী ছিলেন যে, পরবর্তীতে অত্যন্ত কঠিন Wolfsbane Potion ও Veritaserum Potion তৈরি করেছিলেন, অনেক পোশন তৈরির উপায়ও সে উন্নত করেছিলেন যা তার Advance Potion Making বইয়ের কোটেশন এবং নোটস দেখলে বুঝতে পারা যায়, যেটা কিনা পরে হ্যারীর হাতে আসে হাফ ব্লাড প্রিন্সের সম্পত্তি হয়ে (মায়ের নামের থেকে প্রিন্স এবং হাফ ব্লাড হওয়ায় এই নাম দেয় সে নিজেই)। এছাড়াও বিভিন্ন স্পেল যেমন Levicorpus, Sectumsempra ও উদ্ভাবন করেছিলেন সে। নিজের অসাধারণ জ্ঞানের ব্যবহার করেই ডাম্বলডোরের কার্সড হয়ে যাওয়া হাতের সংক্রমণ ধীর গতির করে দিয়েছিলেন তিনি।
যাই হোক, হগওয়ার্টসে যাওয়ার পর অনেক বন্ধুর ভীড়ে লিলি এবং স্নেইপের বন্ধুত্বেও কিছুটা ফাঁটল দেখা দেয়। মান অভিমান আর ভুল বোঝাবুঝির নিষ্ঠুর খেলায় বলি হয় তাদের বন্ধুত্ব। আগুনে ঘি হিসেবে কাজ করে বুলিইং এর কারণে তৈরি হওয়া জেমসের প্রতি স্নেইপের ঘৃণা এবং স্নেইপকে অপ্রত্যাশিতভাবে একবার বাঁচানোর জন্য সেই একই জেমসের প্রতি লিলির কৃতজ্ঞতা। স্নেইপের মাঝে হিংসার মতোন বিধ্বংসী অনুভূতির জন্ম হয় এখান থেকেই।
আমাদের সবার মাঝে খারাপ এবং ভালো দুই দিকই থাকে। পরিবেশ এবং পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে এক একটি দিক এক এক সময় ফুঁটে ওঠে।
তেমনি লিলিকে এক তরফা ভাবে ভালোবাসা স্নেইপ যখন কষ্ট আর হারানোর ক্ষতে আক্রান্ত ঠিক তখনই তার ভেতরের খারাপ দিকগুলো বিকশিত হওয়ার সুযোগ পায়। আর অপ্রত্যাশিতভাবেই সে ভল্ডেমর্ট এর আর্মী হিসেবে যোগদান করে।
স্নেইপের জীবনের সবচেয়ে মারাত্নক ভুলটি হয় এর পরেই। প্রফেসর ডাম্বলডোর এর সাথে প্রফেসর ট্রেলওনির কথোপকথন শুনে ফেলে সে, জেনে যায় গুরুত্বপূর্ণ এক ভবিষ্যতবাণীর কথা,ভল্ডেমর্ট কে মারার একমাত্র অস্ত্রের জন্ম হয়েছে। ডার্ক লর্ডের অনুগত স্নেইপ তা জানিয়ে দেয় ভল্ডেমর্টকে, জানানোর পরই সে বুঝতে পারে কতো বড় ভুল হয়ে গেছে। সেই অস্ত্র আর কেউ নয়, তারই ভালোবাসার মানুষ লিলি এবং জেমসের ঘরে জন্ম নেয়া হ্যারী। হ্যারীকে মারতে গেলে লিলি এবং জেমসকেও মেরে ফেলবে ডার্ক লর্ড। জেমস বা হ্যারির ক্ষেত্রটা বাদ দিলেও, স্নেইপ কখনো চায় নি লিলির মৃত্যুর কারণ হতে।
অসহায় স্নেইপ তখন ডাম্বলডোরের সাহায্য প্রার্থী হয়, প্রার্থনা করে যেন লিলি এবং তার পরিবারকে ভল্ডেমর্ট এর হাত থেকে রক্ষা করে। এর পরিবর্তে ডাম্বলডোর ডার্ক লর্ডকে হারানোর জন্য স্নেইপের আনুগত্য চেয়ে বসেন। সেই থেকে স্নেইপ, লিলির মৃত্যুর পরও তার কথা রেখেছিলেন, ছিলেন ডাম্বলডোরের অত্যন্ত শক্তিশালী, মূল্যবান এবং আস্থাভাজন ব্যক্তি। লিলির আত্মত্যাগকে বৃথা যেতে দেন নি। এই সিরিজের সম্পুর্ণ সময় জুড়ে তাই সবচেয়ে রহস্যময় আর ছদ্মবেশী চরিত্র হিসেবে আমরা স্নেইপকে দেখেছি।
হ্যারি পটার সিরিজের গুরুত্বপূর্ণ একটা মেসেজ ছিল এটাই যে, ভালোবাসা এমনই এক শক্তিশালী জিনিস যা কিনা যেকোন মারাত্মক কার্সকেও ভেঙে দিতে পারে, যার সামনে ডার্ক লর্ডও দূর্বল। লিলির প্রতি সেই ভালোবাসার জন্যই কখনো স্নেইপের আসল উদ্দেশ্য এবং মনকে জানতে পারে নি ভল্ডেমর্ট।
লিলির পর এই সিরিজে একমাত্র স্নেইপই ছিল, যে কিনা প্রথম থেকেই একমাত্র লিলির প্রতি ভালোবাসার জন্যই সব করে গেছেন।
বলা হয় প্রত্যেকের পেট্রোনাস চার্ম তার সবচেয়ে সুখকর স্মৃতির আদলেই তৈরি হয়, তাইতো সেই বাচ্চা বয়স থেকেই লিলির পেট্রোনাসের মতোন স্নেইপের পেট্রোনাস হয়ে গিয়েছিল। কারণ লিলির খুশীই ছিল স্নেইপের খুশী। কতো শত ঘটনা এবং লিলির মৃত্যুর পরেও এই ভালোবাসায় কোন ঘাটতি হয় নি। তার এমন নিঃস্বার্থ আর প্রবল ভালোবাসা দেখেই ডাম্বলডোর বিস্মিত হয়ে বলে ওঠে After all this time?!
স্নেইপের সকল অনুভূতি তখন ওই একবাক্যেই প্রকাশ পায়, Always!
© Byanjon-ব্যঞ্জন
অসাধারণ এই চরিত্রটি যিনি আমাদের সামনে ফুটিয়ে তুলেছেন, সেই গুণী অভিনেতা এলান রিকম্যান এর আজ ৫ম প্রয়াণ দিবস। ওপারে ভালো থাকবেন।💚💚💚