10/05/2026
অপেক্ষার শেষ প্রহর.... ❤🌼
শহরের কোলাহল থেকে অনেক দূরে, জরাজীর্ণ এক বৃদ্ধাশ্রমের বারান্দায় বসে আছেন নীলিমা দেবী। আজ মা দিবস। ক্যালেন্ডারের পাতায় লাল রঙে লেখা দিনটি তার কাছে বিষাদের পাহাড়। নীলিমা দেবীর ঝাপসা চোখ দুটো সারাক্ষণ গেটের দিকে তাকিয়ে থাকে। যদি একবার একটি গাড়ি এসে থামে, আর যদি সেখান থেকে নেমে আসে তার একমাত্র ছেলে আকাশ। নীলিমা দেবীর স্বামী মারা গিয়েছিলেন আকাশ যখন মাত্র পাঁচ বছরের শিশু। তারপর থেকে শুরু হয়েছিল এক মায়ের জীবনযুদ্ধ। মানুষের বাড়িতে কাজ করা থেকে শুরু করে সেলাই মেশিন চালানো—সবই করেছেন তিনি শুধু ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করার জন্য। আকাশ যখন রাতে পড়তে বসত, নীলিমা দেবী পাশে বসে তালপাতার পাখা দিয়ে বাতাস করতেন। নিজে আধপেটা খেয়ে ছেলের পাতে তুলে দিতেন সবটুকু ভালো খাবার। আকাশ মেধাবী ছিল, পড়াশোনা শেষ করে বড় চাকরি পেল, বিয়েও করল। নীলিমা দেবী ভেবেছিলেন জীবনের শেষ কটা দিন হয়তো একটু সুখে কাটবে। কিন্তু নিয়তি ছিল অন্যরকম।
বিয়ের পর আকাশ ধীরে ধীরে বদলে যেতে লাগল। বড় ফ্ল্যাটে মায়ের ছেঁড়া শাড়ি আর খসখসে গায়ের চামড়া যেন তার আভিজাত্যে বাধা হয়ে দাঁড়ালো। একদিন আকাশ বলল, "মা, এই শহরে তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে। চলো তোমাকে এমন জায়গায় রেখে আসি যেখানে তোমার বয়সী অনেক বন্ধু পাবে।" নীলিমা দেবী সেদিন বুঝতে পারেননি 'বন্ধু' বলতে ছেলে বৃদ্ধাশ্রমের কথা বলছে। যেদিন তাকে এখানে রেখে আকাশ চলে যাচ্ছিল, নীলিমা দেবী একবারও কাঁদেননি। শুধু ছেলের মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন, "সাবধানে যাস বাবা, শরীরটার যত্ন নিস।" আজ তিন বছর হয়ে গেল আকাশ আর আসেনি। মাঝে মাঝে নীলিমা দেবী ফোন করার চেষ্টা করেন, কিন্তু ওপাশ থেকে ব্যস্ততার অজুহাতে ফোনটা কেটে দেওয়া হয়। বৃদ্ধাশ্রমের অন্য মায়েরা যখন তাদের সন্তানদের কথা বলে গর্ব করেন, নীলিমা দেবী তখন চুপচাপ জানালার দিকে তাকিয়ে চোখের জল মোছেন।
আজ সকালে বৃদ্ধাশ্রমের আয়া এসে নীলিমা দেবীকে এক তোড়া ফুল দিয়ে বলল, "মাসিমা, আজ মা দিবস। আপনার ছেলে কি আসবে না?" নীলিমা দেবী ম্লান হেসে বললেন, "ও তো খুব বড় অফিসার রে, সময় পায় না। হয়তো আজ আসবে।" বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামল, কিন্তু আকাশ আসলো না। নীলিমা দেবীর শরীরটা আজ বেশ খারাপ লাগছে। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত যন্ত্রণা। তিনি কাঁপা কাঁপা হাতে বালিশের নিচ থেকে আকাশের ছোটবেলার একটা ছবি বের করলেন। ছবিতে ছোট আকাশ তার মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে হাসছে। নীলিমা দেবী অস্ফুট স্বরে বললেন, "খোকা, তুই যেখানেই থাকিস, ভালো থাকিস। আমার মতো অভাগী মা যেন আর কারও ঘরে না জন্মায়।"
রাত বাড়ার সাথে সাথে নীলিমা দেবীর চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। নার্স এসে যখন তাকে রাতের খাবার দিতে ডাকল, তখন নীলিমা দেবী আর উত্তর দিলেন না। তার নিথর হাত থেকে আকাশের সেই ছোটবেলার ছবিটা মেঝেতে পড়ে গেল। পরদিন সকালে আকাশের ফোনে একটা খবর গেল। নীলিমা দেবী আর নেই। আকাশ যখন বৃদ্ধাশ্রমের মর্গে মায়ের মৃতদেহের সামনে এসে দাঁড়াল, তখন তার হাতে ছিল একটা দামি উপহার। কিন্তু সেই উপহার নেওয়ার মানুষটি তখন সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে না ফেরার দেশে চলে গিয়েছেন। মা দিবসের এই উপহার আজ বড়ই নিরর্থক। মা চলে গেলে কোনো বিলাসিতা বা চোখের জল তাকে আর ফিরিয়ে আনতে পারে না।❤🧿
কলমে- মি ষ্টি
Follow us...