01/07/2026
**মিড-ডে মিলের থালায় রাজনীতি নয়,থাকুক শিশুর পুষ্টি ।**
আজ মিড-ডে মিলে ডিম থাকবে কি থাকবে না—এই প্রশ্নে অনেক বিতর্ক হচ্ছে। কিন্তু আমি মনে করি, এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত না ধর্ম, না রাজনীতি। কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত—**শিশু।**
বাংলা নদীমাতৃক অঞ্চল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মাছ, ডিম ও অন্যান্য আমিষ আমাদের খাদ্যসংস্কৃতির অংশ। এটি শুধু স্বাদের বিষয় নয়, এটি ইতিহাস, ভূগোল, কৃষি, অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি বাস্তবতা।
** ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, Swami Vivekananda খাদ্যাভ্যাসকে ধর্মের একমাত্র মানদণ্ড মনে করতেন না। শক্তিশালী, কর্মক্ষম ও সুস্থ মানুষ গড়ে তোলাই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাঁর গুরু **Ramakrishna paramahamsa - এর জীবনেও আমিষ ভোজনের উল্লেখ পাওয়া যায়। তাই বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতিকে একমাত্র নিরামিষের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখার কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।
**Chittaranjan Das বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষার কথা বলেছিলেন। সেই শিক্ষাই আজও প্রাসঙ্গিক—প্রত্যেক অঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতিকে সম্মান করা উচিত।
কিন্তু আমার বক্তব্য সংস্কৃতির থেকেও বড় একটি বিষয় নিয়ে।
ভারতের **ICMR (Indian Council of Medical Research)** এবং **National Institute of Nutrition (NIN)** বহু বছর ধরে বলে আসছে, বেড়ে ওঠা শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত **প্রোটিন, শক্তি, ভিটামিন ও মিনারেল** অত্যন্ত জরুরি। **WHO**-ও সতর্ক করেছে যে, শৈশবের অপুষ্টি শুধু উচ্চতা বা ওজন কমিয়ে দেয় না; এটি মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার ক্ষমতা, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের কর্মক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
ডিমকে বিশ্বের অন্যতম **উচ্চমানের (high biological value) প্রোটিনের উৎস** হিসেবে ধরা হয়। একটি ডিমে এমন প্রোটিন থাকে, যা শরীর খুব সহজে ব্যবহার করতে পারে। পাশাপাশি এতে থাকে ভিটামিন বি₁₂, ভিটামিন ডি, কোলিন, সেলেনিয়ামসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান, যা শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
হ্যাঁ, রাজমা, সয়াবিন, ডাল—এসবও পুষ্টিকর খাবার। কিন্তু এগুলো ডিমের বিরোধী নয়; বরং পরস্পরের পরিপূরক। প্রশ্ন হলো, বাংলার যে সব পরিবার সপ্তাহে একদিনও ডিম, মাছ বা মাংস কিনতে পারেন না,
তাদের সন্তানের জন্য স্কুলের একটি ডিম কী কেবল একটি খাবার, নাকি একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির সুযোগ?
আমার গ্রামে আজও অনেক পরিবার আছে, যেখানে বাবা-মা ইচ্ছা থাকলেও সন্তানকে নিয়মিত আমিষ খাওয়াতে পারেন না। সেই শিশুদের জন্য মিড-ডে মিলের ডিম কোনো বিলাসিতা নয়; এটি তাদের বেড়ে ওঠার একটি মূল্যবান সহায়তা।
আমি কোনো নিরামিষভোজীর বিরুদ্ধে নই। যে নিরামিষ খেতে চান, তাঁর সেই অধিকার অবশ্যই আছে। কিন্তু কোনো অঞ্চলের খাদ্যসংস্কৃতি, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং শিশুদের পুষ্টির প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে এক ধরনের খাদ্যনীতি চাপিয়ে দেওয়া হলে প্রশ্ন তোলাও নাগরিকের অধিকার।
মিড-ডে মিলের উদ্দেশ্য কোনো মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা করা নয়। এর উদ্দেশ্য—অপুষ্টি কমানো, স্কুলে উপস্থিতি বাড়ানো এবং একটি সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তোলা।
"পশ্চিমবঙ্গে ৫-১০ বছর বয়সী শিশুদের উপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৩৩% শিশু কম ওজনের (Underweight), ২৫.৪৮% শিশু খর্বাকৃতির (Stunting) এবং ২৬.৮৮% শিশু অতিরিক্ত রোগা (Thinness)। এই বাস্তবতায় সরকার ও সমাজের প্রথম দায়িত্ব হওয়া উচিত প্রতিটি শিশুর পাতে পর্যাপ্ত ও বিজ্ঞানসম্মত পুষ্টি পৌঁছে দেওয়া।"
শিশুর থালায় কী থাকবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় একটাই প্রশ্ন করা উচিত—
**এতে কি শিশুর স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ আরও ভালো হবে?
যদি উত্তর "হ্যাঁ" হয়, তবে সেই সিদ্ধান্তই হওয়া উচিত।
**কারণ ক্ষুধার কোনো ধর্ম নেই। অপুষ্টিরও কোনো ধর্ম নেই। কিন্তু একটি সুস্থ শিশুই একটি শক্তিশালী ভারতের ভিত্তি।*
এবার আপনাদের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন—
১. মিড-ডে মিলের মূল উদ্দেশ্য কী—শিশুর পুষ্টি, নাকি খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন?
২. পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান বাস্তবতায় ডিমের পরিবর্তে নিরামিষ খাবার কি একইভাবে সব শিশুর পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে পারবে?
৩. যে দরিদ্র পরিবার সপ্তাহে একদিনও সন্তানকে ডিম, মাছ বা মাংস খাওয়াতে পারে না, সেই শিশুর জন্য স্কুলের একটি ডিমের মূল্য কতটা?
৪. শিশুদের খাদ্যতালিকা কি বিজ্ঞান ও পুষ্টিবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারিত হওয়া উচিত, নাকি অন্য কোনো বিবেচনায়?
🔹 নীতিনির্ধারণের সময় কি আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত শিশুদের স্বাস্থ্য, নাকি মতাদর্শ?
আপনার মত কী?
আপনি কি মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় মিড-ডে মিলে ডিম থাকা উচিত?
নাকি আপনার মতে অন্য কোনো নিরামিষ বিকল্প একইভাবে প্রতিটি শিশুর পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে পারে?
আপনার মতামত কী?
তথ্য ও যুক্তি দিয়ে মন্তব্য করুন। ভিন্ন মত থাকলে সেটিও সম্মানের সঙ্গে কমেন্টে জানান। কারণ সুস্থ আলোচনা থেকেই সঠিক পথ বেরিয়ে আসে।