13/09/2026
এই ছবিটা আমার সারা জীবনে পাওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার।
দেখলে মনে হবে খুব সাধারণ একটা দৃশ্যায়ন বা কোনো এক মফস্বলে গৃহস্থ বাড়ির দৃশ্যপট।
হ্যা দৃশ্যপট তো বটেই, এটা এমন একটা চিত্রগল্প যা এক ঝটকায় এক মধ্য বয়স্ক নারীকে তার শৈশবে নিয়ে যায়।
আমি আমার স্বামী একসাথে সময় কাটালে অনেক অনেক গল্প করি। আমরা দুজনেই গল্প করতে খুব ভালোবাসি। তাই হাজারো গল্পের মাঝে অনেক বার উঠে এসেছে ছোট্ট একটা দুষ্টু মেয়ের একলা একান্তে কাটানো সময়ের গল্প।
আমি তখন খুব ছোট, বাবার গভর্নমেন্ট চাকরির সুবাদে বেশিরভাগ ভাগ সময়ই জেলায় জেলায় থাকা হত বাবার।
আমি, আমার দুভাইকে নিয়ে মা থাকতেন ঢাকায় আমাদের এই বাড়িতে । মা সারাজীবনই রুটিনে চলা এক আটপৌরে গৃহিনী ছিলেন।
ভোরে আজানের পর আমার মাকে আমি কখনোই বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখিনি। তা বাবা থাকুক বা না থাকুক।
তাঁর জীবন এক নিয়মে চলতো। সকাল সাতটায় নাস্তা, দুপুরের দেড়টা থেকে দুটোর মধ্যে লাঞ্চ, বিকেলে চারটা পাঁচটার দিকে বিকেলের নাস্তা আর রাতের খাবার নয়টায় শেষ করে দশটায় সব প্যাকআপ ঘুমের জন্য।
যেহেতু এত ভোরে মা উঠতেন তাই দুপুরের ভাতঘুম ছিলো অপরিহার্য। দুপুরে ঘুমাতে না পারলে মা অসুস্থ হয়ে যেতো।
তাই আমাদের তিন ভাই-বোনকে নিয়ে মা এক বিছানায় ঘুমাতেন। আর আমি যেহেতু সবচেয়ে ছোট তাই মা আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতেন।
কিন্তু মজার বিষয় হলো আমি কোনোদিন দুপুরে ঘুমাতাম না। আমার ডানপিটে মন অস্থির হয়ে থাকতো দুপুরের এই অলস সময়ের জন্য।
আমার দু ভাই কিন্তু ছোটবেলায় খুব লক্ষী ছিলো। মা নিয়ে ঘুমালেই এরা চুপচাপ ঘুমিয়ে পরতো।
ত্যাদর তো ছিলাম আমি। সবার আদরের বাদর।
যখন বাড়ির সবাই ঘুম, বাহিরে শান্ত অলস দুপুর তখন আস্তে করে উঠে পা টিপে টিপে বের হয়ে আসতাম আমি। মজার বিষয় হলো, মা এতোটাই ঘুমে বিভোর থাকতো যে কখনোই টের পেতো না আমার উঠে আসা।
আমাদের এ বাড়ির রাস্তা ঘেঁষে ছিলো অনেক গাছ। আমার মা আর বাবার লাগানো। তেজপাতা, লিচু,আম গাছ আর ছিলো অনেকগুলো বারো মাসি পেয়ারা গাছ।
গাছ ভর্তি করে সারাবছর পেয়ারা হতো। মা বলতেন, যে গাছ রাস্তার ধারে হয় এবং সকল মানুষ সে ফল খায়, সে গাছে নাকি আলাদা রহমত থাকে। তাই আমাদের রাস্তার ধারের পেয়ারা গাছ এত ফল দিত যে, পেয়ারার কারনে পাতা দেখা যেতো না। রাস্তায় রিকশওয়ালা, ট্রাক ডাইভার থেকে সকলে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় পেয়ারা ছিঁড়ে খেতে খেতে যেতো।
এত পেয়ারা হতো যে মাও কিছুই বলতো না কাওকে।
আর এ পেয়ারা গাছ ছিলো আমার আস্তানা।
বাড়ির চালে সব সময় একটা মই পাতা থাকতো। আর আমার কাজ থাকতো চুপিচুপি সেই মই বেয়ে ছাদে চলে যাওয়া।
গাছের আড়ালে বসে পাকা পেয়ারা পেরে জামার কোছরে জমিয়ে, বাড়ির সামনে বিশাল দিঘির জলে প্রতিবেশী মাসি,পিসিদের স্নান করা, থালাবাসন ধোওয়া,রাস্তায় পথচারীদের চলাফেরা, সারা দুপুর জুড়ে হকারদের হাঁক দেয়া,সব গাছের আড়ালে বসে বসে দেখা ছিলো সারাদুপুর জুড়ে আমার কাজ। কি যে ভালো লাগতো আমার এগুলো দেখতে।
আবার মাঝে মাঝে চাল ভেজে অথবা বড় বড় আলুর দম বানিয়ে নিয়ে ছাদে বসে খেতাম আর একই জিনিস দেখতাম।তখন বড় আলুর দম মন্দিরের পাশে রাস্তায় খুব বিক্রি হতো।
এখন ভাবলেই অবাক লাগে ওইটুকুন বাচ্চা আমি।কি সুন্দর চাল ভাজছি,আলুর দম রান্না করছি। কি ছাই পারতাম সেটা বড় কথা না কিন্তু করতাম তো ঠিকি।
কিভাবে করতাম এতসব মায়ের চোখ আড়াল করে?
আমি কোনো দুপুর মিস করতাম না আমার নিজের সাথে কাটানো এই সময়টাকে।
শুধুমাত্র শুক্রবার দুপুর ছিলো আলাদা।
কারন শুক্রবার দুপুর গুলো আমরা সবাই একসাথে পূর্ণ দৈর্ঘ্য বাংলা সিনেমা দেখতাম বিটিভিতে। আর আমার মা ছিলেন বাংলা সিনেমার ডাই হার্ট ফ্যান।তাই শুধুমাত্র শুক্রবার দুপুর ছিলো ব্যাতিক্রম।
এখানে যে ছবিটা দেখতে পাচ্ছেন এটা সে গল্পের প্রতিচ্ছবি। আমার কাছ থেকে বহুবার শুনা গল্পের দৃশ্যায়ন এটি আমার স্বামীর। এ ছবিটি ছিলো এবার জন্মদিনে তার দেয়া উপহার।
এ ছবিটি দেখে যে আমি কত কেঁদেছি, কত কেঁদেছি।
আমি যতটা অবাক হয়েছি তারচেয়েও বেশি হয়েছি আবেগপ্রবণ।
অবাক হয়েছি কারন, সে আমাদের আগের বাড়ি দেখেনি।দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে আমাদের সে বাড়ির কোনো ছবিও নেই আমাদের কাছে। এখন এ জায়গায় ইটপাথরের দালান।
শুধুমাত্র আমার গল্পের আদলে সে পুরো ছবিটি চিত্রায়িত করেছে।
তাকে ধন্যবাদ আমি দিতে পারিনি।
শুধু চোখের পানিতে ভেসেছি আর বলেছি
“আমি অকৃত অধম জেনেও তো মোরে কম করে কিছু দাও নি”
#স্মৃতি #শৈশব #জীবনেরকথা