23/09/2026
আজ ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম: স্কুলে ছুটি, অফিসে নয়—এই দিনের ইতিহাস জানেন?
ক্যালেন্ডারে ‘ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম’ নামটি চোখে পড়েছে নিশ্চয়ই। ছোটবেলায় এই নামের সঙ্গে অনেকের পরিচয়ও হয়েছে স্কুলের ছুটির সুবাদে। কিন্তু ‘ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম’ আসলে কী? কেন এই দিনটি পালন করা হয়? আর কেন স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকলেও সরকারি অফিস, ব্যাংক কিংবা অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক কার্যক্রম চলে?
নামটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে এই দিনের পরিচয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় নয় শতাব্দী আগের এক সুফি সাধক, দক্ষিণ এশিয়ার দীর্ঘ ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং হিজরি বর্ষপঞ্জির একটি বিশেষ তারিখ।
‘ইয়াজদাহম’ মানে কী?
‘ইয়াজদাহম’ একটি ফারসি শব্দ। এর অর্থ "এগারো"। আরবি হিজরি বর্ষপঞ্জির রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখকে কেন্দ্র করেই এই স্মরণানুষ্ঠানের প্রচলন।
দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে দিনটি আবার ‘গিয়ারভি শরিফ’ নামেও পরিচিত। উর্দু ভাষায় ‘গিয়ারহ’ অর্থ এগারো। সেখান থেকেই ‘গিয়ারভি’ বা ‘গিয়ারহভি’ নামের প্রচলন।
‘ফাতেহা’ বলতে সাধারণত কোরআন তিলাওয়াত, দোয়া-মোনাজাত এবং ইসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে ধর্মীয় আয়োজনকে বোঝানো হয়।
অর্থাৎ সহজ ভাষায়, ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম হলো ১১ রবিউস সানিকে কেন্দ্র করে হজরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর স্মরণে পালিত একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান।
যার স্মরণে এই আয়োজন-
ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমের সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত নামটি হলো হজরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)।
তিনি ছিলেন দ্বাদশ শতকের একজন প্রভাবশালী ইসলামি আলেম, শিক্ষক, ধর্মপ্রচারক ও সুফি সাধক। আনুমানিক ১০৭৭-৭৮ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের জিলান অঞ্চলে তাঁর জন্ম। পরবর্তী জীবনের বড় একটি সময় তিনি বাগদাদে কাটান এবং সেখানে ইসলামি জ্ঞানচর্চা ও ধর্মীয় শিক্ষাদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
তাঁর জ্ঞান, বক্তৃতা ও আধ্যাত্মিক শিক্ষার প্রভাব তাঁর জীবদ্দশাতেই ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, তিনি হিজরি ৫৬১ সালের ১১ রবিউস সানি, অর্থাৎ ১১৬৬ খ্রিস্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। তাঁর ইন্তেকালের দিনকে স্মরণ করেই পরবর্তী সময়ে ১১ রবিউস সানিতে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম পালনের রীতি জনপ্রিয় হয়।
আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর শিক্ষা কী ছিল?
আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর শিক্ষা শুধু আধ্যাত্মিক সাধনার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন, নৈতিক চরিত্র গঠন, আত্মসংযম, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং আত্মশুদ্ধি ছিল তাঁর শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাঁর নামে প্রচলিত বেশ কিছু গ্রন্থ ও বক্তৃতাসংকলনের মধ্যে ‘ফুতুহ আল-গায়ব’ এবং ‘আল-গুনিয়া লি তালিবি তারিকিল হক’ বিশেষভাবে পরিচিত।
তাঁর শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে 'কাদেরিয়া সুফি তরিকা' ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়। এই সুফি ধারা পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়াসহ মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমে কী করা হয়?
অঞ্চল ও পারিবারিক রীতি অনুযায়ী আয়োজনের ধরন ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণত এদিন ধর্মীয় আলোচনা, কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়া-মোনাজাতের আয়োজন করা হয়।
কোথাও আয়োজন করা হয়—
* কোরআন তিলাওয়াত
* সূরা ফাতিহা পাঠ
* জিকির ও দোয়া
* ওয়াজ ও ধর্মীয় আলোচনা
* ইসালে সওয়াব
* দরিদ্র মানুষের মধ্যে খাবার বিতরণ
অনেক খানকাহ শরিফে এ উপলক্ষে বিশেষ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। আবার কোনো কোনো পরিবার নিজেদের মতো করে কোরআনখানি ও দোয়ার আয়োজন করে।
বাংলাদেশে কবে থেকে প্রচলন?
বাংলাদেশে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমের ইতিহাসও বেশ পুরোনো।
পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারের "মিয়া সাহেবের ময়দান খানকাহ শরিফে" কয়েক শতাব্দী ধরে এ উপলক্ষে আয়োজন হয়ে আসছে বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও স্থানীয় বর্ণনায় উল্লেখ পাওয়া যায়।
অর্থাৎ বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অনেক আগেই এ অঞ্চলের মুসলিম সমাজে দিনটি ধর্মীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছিল।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি শুধু খানকাহ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; সাধারণ মানুষের মধ্যেও দিনটির পরিচিতি তৈরি হয়েছে।
তাহলে স্কুল বন্ধ থাকে, অফিস কেন নয়?
এখানেই সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তি তৈরি হয়। ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম বাংলাদেশের সবার জন্য বাধ্যতামূলক সাধারণ ছুটি নয়। সরকারি ছুটির কাঠামোয় এটি মুসলিমদের জন্য 'ঐচ্ছিক ছুটি' হিসেবে থাকতে পারে।
তাই সরকারি অফিস, ব্যাংক কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এদিন স্বাভাবিক কার্যক্রম চলতে পারে।
কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শিক্ষাপঞ্জি আলাদাভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি নির্ধারণ করে। সেই কারণে স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম উপলক্ষে ছুটি থাকতে পারে।
অর্থাৎ 'সরকারি ছুটি’ এবং ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি’ একই বিষয় নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে নিয়ম আলাদা কেন?
স্কুল-কলেজের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটির কাঠামো এক নয়। বিশেষ করে স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ছুটি নির্ধারণ করতে পারে। তাই একটি বিশ্ববিদ্যালয় ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমে বন্ধ থাকলেও অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রম চলতে পারে।
এ কারণে ‘আজ ছুটি’ কথাটি শুনেই সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা অফিস বন্ধ থাকবে—এমনটা ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
প্রতি বছর তারিখ বদলে যায় কেন?
এর কারণ হিজরি বর্ষপঞ্জি। গ্রেগরিয়ান বা ইংরেজি ক্যালেন্ডার সৌরভিত্তিক হলেও হিজরি ক্যালেন্ডার চন্দ্রভিত্তিক। একটি হিজরি বছর সাধারণত ইংরেজি বছরের চেয়ে প্রায় ১০ থেকে ১১ দিন ছোট। ফলে ১১ রবিউস সানি প্রতি বছর ইংরেজি ক্যালেন্ডারে একটু আগে চলে আসে।
এই কারণেই কোনো বছর ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম অক্টোবর মাসে, আবার কোনো বছর সেপ্টেম্বর বা তারও আগে হতে পারে।
শুধু ছুটির দিন নয়, ইতিহাসেরও অংশ
ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহমকে অনেকেই শুধু ‘স্কুলের ছুটি’ হিসেবে চেনেন। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস।
হজরত আবদুল কাদির জিলানী (রহ.)-এর জ্ঞানচর্চা, ধর্মীয় শিক্ষা ও সুফি ভাবধারা মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রভাব ফেলেছে। তাঁর সঙ্গে যুক্ত কাদেরিয়া তরিকা পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ এশিয়াতেও বিস্তার লাভ করে। আর সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যেরই একটি স্মরণধর্মী প্রকাশ হলো ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম।
তাই ক্যালেন্ডারে একটি ছুটির নাম হিসেবে যে শব্দটি আমরা দেখি, তার পেছনে রয়েছে ইতিহাস, সুফি ঐতিহ্য, ধর্মীয় অনুশীলন এবং কয়েক শতাব্দী ধরে চলে আসা মানুষের স্মরণ ও প্রার্থনার সংস্কৃতি। ফাতেহা-ই-ইয়াজদাহম তাই শুধু একটি ছুটির দিন নয়—দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম ধর্মীয় সংস্কৃতির ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মরণদিবস।