21/05/2026
“বউয়ের বাপের বাড়ি দিয়ে সোনার কিছু দেয়নি?”
চাচী শাশুড়ী কথা শুনে শাশুড়ী আফসোসের সুরে বললেন,“না। সোনা তো দূর এক গাছ কুটাও(খড়) দেয় নাই। এমনই ভিখারি বাড়ি থেকে মেয়ে নিয়ে আসছি।”
শাশুড়ীর কথা শুনে চাচী শাশুড়ী বিলাপ করতে শুরু করে। আমার শাশুড়ীর কপাল খুব খারাপ। নয়তো এমন ভিখারি বংশের মেয়ে জুটে কপালে। সেদিনই প্রথম তারা এমনভাবে অপমান করার সুযোগ পেয়েছিলো। এরপর কখনো পায়নি। কারণ সেদিন তাদের সব কথা আমার স্বামী পলাশ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে শুনেছে। সঙ্গে সঙ্গে সে প্রতিবাদ করে বলে,“তোমরা এভাবে আমার স্ত্রীকে বলছো কেন? শুধু যে ওর বাবা, মা ওকে সোনার জিনিস দেয়নি এমন তো নয়? আমরাও তো দেইনি। তাহলে কি আমরা ভিখারি পরিবার নই? আর দুই ভিখারি পরিবারে মিল হওয়াই তো ভালো।”
পলাশের এই কথাটি শাশুড়ী হজম করতে পারলো না। সে উচ্চবংশীয় মেয়ে। তার সঙ্গে ভিখারি যায়? যায় না। যার জবাবে পলাশ আবার বলে,“তবে নিজের বৌমাকে গয়না দিয়ে ঘরে তুলতে পারোনি কেন? যখন পারোইনি তখন এখানে বসে গয়নার কথা তুলছো কেন? তার পরিবারকেও বা টানছো কেন?”
এই কথা শুনে শাশুড়ী মা চুপ হয়ে যায়। চাচী শাশুড়ী কিছু বলতে নিলে পারে না। পলাশ সেই সুযোগ দেয় না। সে খুব সুন্দরভাবে বলে,“শুনুন চাচী, বর্তমান বাজারদরের অবস্থা ভালো না। এই সময়ে এসে সোনার জিনিস দেওয়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার। বিয়ে করে যাকে নিয়ে এসেছি সেও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের। আমাদের কারো পক্ষেই সোনার গহনা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তাই এটা নিয়ে কথা না বলাই ভালো।”
একটু থেমে পলাশ আবার বলে,“চাচী আজ আমি ভদ্রভাবে বললাম। তবে পরবর্তীতে যদি দেখি আপনি বা কেউ বাড়ি বয়ে এসে কুটকাচালি করে আমার স্ত্রীর অসম্মান করার চেষ্টা করছেন তবে কিন্তু আমি ছেড়ে কথা বলবো না।”
“তুই তোর চাচীর সঙ্গে এভাবে কথা বলছিস?”
শাশুড়ী মা অবাক হয়ে জানতে চায়। পলাশ মাথা নাড়িয়ে বলে,“সে যতটা শোনার যোগ্য ততটা বলিনি। আর হ্যাঁ মা তোমাকে বলছি অন্যের কথা নিয়ে ঘরের মধ্যে অশান্তি করো না। একটা কথা মাথায় রেখো ও আমার স্ত্রী। আমার দায়িত্ব। আমার সম্মান। তাই এমন কিছু বলো না বা করো না যাতে ওর অসম্মান হয়। এটা কিন্তু আমি মানবো না।”
সেদিন পলাশের কথার তেজ দেখে শাশুড়ী মা দ্বিতীয়বার ঐ কথা তোলার সাহস পায়নি। আর কখনো কেউ আমার গায়ে সোনার গহনা নাই কেন এই প্রশ্ন করতে পারেনি। না আমার পরিবারকে কেউ ভিখারি বলতে পারছে। শুধু তাই নয়, শ্বশুড়বাড়িতে আমার কখনো কোন অসুবিধা হয়নি। কেউ আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করার সুযোগ পায়নি। যেটা সম্ভব হয়েছে পলাশের জন্য। পলাশ স্বামী হিসাবে আমার পাশে ছিলো বলেই আমার সংসার জীবনটা সহজ হয়েছে।
আমার এখনো মনে পড়ে, সেদিন বাড়িতে মাছ মাংস হতে সব রান্না হয়েছিলো। কিন্তু আমার পাতে শুধু ডাল সবজি আর মুরগির পা পড়ছিলো। এটাই ছিলো আমার দুপুরের খাবার। যেটা পলাশের চোখে পড়ার পর পলাশ এসে আমার পাশে বসে। তার পাত থেকে মাংস তুলে আমার পাতে দেয়। তার এমন কান্ডে শাশুড়ী মা অবাক হয়ে জানতে চায়,“তুই তোর সব মাংস ওকে দিলে নিজে খাবি কি?”
“তোমার হাঁড়িতে যদি আমার স্ত্রীর জন্য মাংস, মাছ রান্না না হয় তবে তো আমাকে মাছ মাংস ছাড়াই খাওয়ার অভ্যাস করতে হবে।”
সেদিনই প্রথম এমন ঘটনা ঘটে। এরপর কোনদিন আমার পাতে মাছ, মাংসের অভাব হয়নি। আর কখনো খাওয়ার কষ্ট হয়নি। পলাশের জন্য কেউ কখনো আমাকে কথা শোনাতেও পারেনি। কখনো অসম্মান করার সুযোগ পায়নি।
হ্যাঁ পলাশের এভাবে আমার পাশে থাকায় শাশুড়ী মা, ননদ একটু অসন্তুষ্ট ছিলেন। তার আড়ালে অবশ্য বলে বেড়াতেন,“আমার ছেলেকে এই মেয়ে তাবিজ করেছে। এই মেয়ে ভালো না।” কিন্তু প্রকাশ্যে কখনো বলার সাহস পায়নি। কারণ এসব কথা পলাশের কানে গেলে সে প্রতিবাদ করতো।
পলাশের এই প্রতিবাদ। তার পাশে থাকা আমার সংসার জীবনকে সুন্দর করে তুলেছে। বিয়ের প্রথম প্রথম কাজ পারতাম না। এটা নিয়ে শাশুড়ী কখনো বকার সুযোগ পায়নি। পলাশ প্রথম দিকেই স্পষ্ট করে বলেছিলো,“ও আমার স্ত্রী। ও ভুল করলে ওকে শাসন করার অধিকার আমি ব্যতীত কারো নেই। ও সদ্য বউ হয়েছে। সংসারের কাজ, দায়িত্ব হয়তো বুঝবে না। তোমরা ওকে সব শেখাও৷ শেখানোর পরও যদি না পারে তখন আমি ব্যবস্থা নিবো। কিন্তু অযথা ওর সঙ্গে তর্ক করবে না। ও কাজ পারে না দেখে কথা শোনাবে না। আগে কাজ শেখাও তারপর যা বলার বলো।”
ব্যস। তার এই কথাই যথেষ্ট ছিলো। এরপর কাজ নিয়ে তত প্যারা খেতে হয়নি। তাই বলে এমন নয় গায়ে হাওয়া লাগিয়ে চলেছি। বরং স্বামীর কথা মেনে তাদের শেখানো অনুযায়ী সব শিখে নিয়েছি। দায়িত্ব খুব দ্রুত বুঝে নিয়েছি। কারণ পলাশ বিয়ের প্রথম রাতেই বলে দিয়েছিলো,“এই সংসার তোমার। এখানে থাকতে হলে তোমাকে দায়িত্ব নিতে হবে। কোন হেলাফেলা করা যাবে না। হ্যাঁ স্বামী হিসাবে আমাকে যেভাবে তোমার পাশে দরকার সেভাবে আমি থাকবো। তবে তোমাকেও কথা দিতে হবে, তুমি এই সংসারকে আপন করে তার প্রতি থাকা তোমার সব দায়িত্ব কর্তৃব্য যথাযথ পালণ করবে।”
পলাশের সেই কথা মেনে আমি সব করেছি। খুব অল্প সময়ে সংসারটাকে আপন করে নিয়েছি। এই সংসারও আমায় আপন করে নিয়েছি। অবশ্য নিতে বাধ্য হয়েছে পলাশের জন্য। যদিও বিয়ের আগে আমার সংসার জীবন নিয়ে নানা ভয় ছিলো। আপাকে দেখেছি, সারা রাজ্যের কাজ করার পরও শ্বশুড়বাড়িতে কারো মন পায়নি। বরং দু’দিন পর পর অশান্তি হয়। বাবার বাড়ি এসে কেঁদেকেঁদে নিজের দুঃখ ভাগ করে নেয়। অনেক বান্ধবীকেও দেখেছি। শ্বশুড়বাড়ি মানে তাদের কাছে নরক। তাদের সংসার জীবনের ভয়াবহ গল্প শুনে মনের মধ্যে অজান্তে ভয় জন্ম নিয়েছিলো। কিন্তু বিয়ের পর বুঝেছি, সংসার জীবন ততটাও খারাপ নয়। এটাও সুখের। তবে এই সুখটা এমনি এমনি আসবে না। এজন্য একজন প্রকৃত স্বামী প্রয়োজন। একজন যোগ্য স্বামীর হাত ধরে শুরু করা সংসার কখনো দুঃখের হয় না। একজন স্বামী যদি শুরু থেকেই তার স্বামী হওয়ার দায়িত্ব পালণ করে তবে সংসারের এত এত যুদ্ধ অনেকটা কমে যাবে। এক সময় হয়তো পুরোটা কমে যাবে। কিন্তু আফসোস সবাই তো পলাশের মতো স্বামী পায় না। তাই তো সবার জন্য সংসার জীবনটা এত কঠিন।
©নুসরাত জাহান মিষ্টি*