26/05/2026
📌 আরাফাহর দিনে যেভাবে আমল করলে দু'আ কবুল হবে: একটি পূর্ণাঙ্গ গাইডলাইন
প্রথমেই বলি, আরাফাহর দিনটিকে অন্য দশটা সাধারণ দিনের মতো কাটাবেন না প্লিজ। সেদিন নিজেকে দুনিয়ার সমস্ত ব্যস্ততা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে নিন। হৃদয়ের দরজাগুলো খুলে দিন শুধু আপনার রব্বের জন্য। এমনভাবে তাঁর দিকে ফিরুন, যেন সেদিন আপনি শুধু আল্লাহর, আর আল্লাহই আপনার। দু'আ কবুলের এমন মহামূল্যবান মুহূর্তকে এক সেকেন্ডের জন্যও হাতছাড়া করবেন না।
▫️ আরাফাহর দিনের বিশেষ আমলসমূহ
১. রাতে তাহাজ্জুদ আদায়
রাতে অবশ্যই শেষভাগে উঠে তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করবেন ইন শা আল্লাহ।
হায়িযগ্রস্ত (ঋতুবতী) বোনদের জন্য পরামর্শ: আপনারা সালাত ও সরাসরি কুরআন স্পর্শ করা ছাড়া বাকি সব আমল করতে পারবেন। তাহাজ্জুদের সময় উঠে অজু করে, সম্ভব হলে সুন্দর পোশাক পরিধান করে জায়নামাজে দু'আ এবং যিকির করতে বসে যাবেন।
২. নফল সালাত ও সালাতুল হাজত
এই দিন সারাদিন প্রচুর পরিমাণে নফল সালাত আদায়ের চেষ্টা করবেন।
বিশেষ করে নিজের প্রয়োজনগুলোর জন্য সালাতুল হাজত (প্রয়োজন পূরণের সালাত) পড়ে আল্লাহর কাছে রোনাজারি করুন।
৩. আরাফাহর দিনের সেরা যিকির
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, "উত্তম দু‘আ হলো আরাফাহ দিবসের দু‘আ। আর আমি ও আমার পূর্ববর্তী নবীগণের বলা সর্বোত্তম যিকির হলো—"
আরবি: لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুওয়া ‘আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর।
অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই। রাজত্ব একমাত্র তাঁরই, সমস্ত প্রশংসাও তাঁরই, আর তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।
📜 [সুনান আত-তিরমিযী, হাদিস নং ৩৫৮৫]
৪. দরূদে ইবরাহীম পাঠ
যেকোনো দু'আ কবুলের অন্যতম শর্ত হলো দরূদ পাঠ। তাই ছোট দরূদের চেয়ে দরূদে ইবরাহীম (যা আমরা সালাতে পড়ি) বেশি বেশি পাঠ করুন।
৫. ইসমে আযম সম্বলিত পাওয়ারফুল দু‘আসমূহ
হাদিসে এসেছে, এই নামগুলোর উসিলা দিয়ে চাইলে আল্লাহ কখনো ফিরিয়ে দেন না।
প্রথম দু‘আ:
আরবি: اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنَّ لَكَ الْحَمْدُ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ الْمَنَّانُ بَدِيعُ السَّمٰوَاتِ وَالْأَرْضِ يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা বিআন্না লাকাল হামদ, লা ইলাহা ইল্লা আনতাল মান্নান, বাদীউস সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্ব, ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরম, ইয়া হাইয়্যু ইয়া ক্বাইয়্যুম।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি। সমস্ত প্রশংসা আপনার। আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আপনি মহান অনুগ্রহকারী, আসমান ও জমিনের স্রষ্টা, হে মহিমা ও সম্মানের অধিকারী, হে চিরঞ্জীব, হে সবকিছুর ধারক ও রক্ষক।
📜 [সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ১৪৯৫]
দ্বিতীয় দু‘আ:
আরবি: اللَّهُمَّ إِنِّ أَسْأَلُكَ بِأَنِّي أَشْهَدُ أَنَّكَ أَنْتَ اللّٰهُ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ الْأَحَدُ الصَّمَدُ الَّذِي لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা বিআন্নী আশহাদু আননাকা আনতাল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লা আনতাল আহাদুস সমাদ, আল্লাযী লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইয়ূলাদ, ওয়া লাম ইয়াকুল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আপনিই আল্লাহ। আপনি একক, অমুখাপেক্ষী। যিনি কাউকে জন্ম দেননি, তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি এবং তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।
📜 [সুনান আত-তিরমিযী, হাদিস নং ৩৪৭৫]
৬. ক্ষমা ও দু'আ কবুলের বিশেষ যিকির
সারাদিন এই যিকিরটি বেশি বেশি মুখে জারি রাখুন:
আরবি: لَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ، سُبْحَانَ اللّٰهِ، وَالْحَمْدُ لِلّٰهِ، وَلَا إِلٰهَ إِلَّا اللّٰهُ، وَاللّٰهُ أَكْبَرُ، وَلَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللّٰهِ
উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ওয়া হুওয়া ‘আলা কুল্লি শাইয়িন ক্বাদীর। সুবহানাল্লাহ, ওয়ালহামদুলিল্লাহ, ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার, ওয়া লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
👉 এরপর বলুন: "رَبِّ اغْفِرْ لِي" (রব্বিগফিরলী — হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করুন) এবং নিজের মনের সমস্ত চাওয়াগুলো নিয়ে দু‘আ করুন।
▫️ কুরআনের আয়াতের উসিলা দিয়ে যেভাবে দু'আ করবেন
আল্লাহর কালামের আয়াত নিয়ে চিন্তা করে এবং আয়াতে বর্ণিত আল্লাহর ক্ষমতা ও রহমতকে সামনে রেখে দু‘আ করলে হৃদয়ে আশা ও ইয়াকীন (দৃঢ় বিশ্বাস) বহুগুণ বেড়ে যায়।
১. সূরা মারইয়াম, আয়াত: ৯
আরবি: هُوَ عَلَيَّ هَيِّنٌ
অর্থ: "এটা আমার জন্য সহজ।"
🤲 যেভাবে দু‘আ করবেন: "হে আল্লাহ! যে বিষয়টাকে আমি দুনিয়াবি নিয়মে অসম্ভব ভাবছি, আপনি তো বলেছেন— 'এটা আমার জন্য সহজ।' আপনার জন্য তো কোনো কিছুই কঠিন নয়। যদি এতে আমার কল্যাণ থাকে, তবে আপনার কুদরতে আমার জন্য এটাকে সহজ করে দিন।"
২. সূরা ইয়াসীন, আয়াত: ৮২
আরবি: إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَنْ يَقُولَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ
অর্থ: "তিনি যখন কোনো কিছুর ইচ্ছা করেন, তখন শুধু বলেন 'হও', আর তা হয়ে যায়।"
🤲 যেভাবে দু‘আ করবেন: "হে আল্লাহ! আপনার একটিমাত্র শব্দ 'কুন' (হও) এর ওপর পুরো মহাবিশ্ব নির্ভরশীল। আমার এই অতি প্রয়োজনীয় হাজতটি যদি আমার দ্বীন ও দুনিয়ার জন্য কল্যাণকর হয়, তবে আপনার রহমতের 'কুন' শব্দ দিয়ে তা পূর্ণ করে দিন।"
৩. সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৫৩
আরবি: لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللّٰهِ
অর্থ: "আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।"
🤲 যেভাবে দু‘আ করবেন: "হে আল্লাহ! আমি চরম অপরাধী, কিন্তু আপনার আদেশ মেনে আপনার রহমত থেকে নিরাশ হতে চাই না। আমার গুনাহ যত বড়ই হোক, আপনার ক্ষমার পরিধি তার চেয়েও বিশাল। আমাকে ক্ষমা করে দিন।"
৪. সূরা আত-তালাক, আয়াত: ২-৩
আরবি: وَمَنْ يَتَّقِ اللّٰهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
অর্থ: "যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য বের হওয়ার পথ তৈরি করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক দেন, যা সে কল্পনাও করে না।"
🤲 যেভাবে দু‘আ করবেন: "হে আল্লাহ! আপনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে মুত্তাকীদের জন্য আপনি অপ্রত্যাশিত পথ খুলে দেন। আমি আজ চারদিকের অন্ধকার থেকে বের হওয়ার জন্য আপনার কাছেই সাহায্য চাচ্ছি। আমার জন্য উত্তম ও হালাল রিযিকের ব্যবস্থা করে দিন।"
৫. সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৬ (আরাফাহর দিনের জন্য একদম পারফেক্ট আয়াত!)
আরবি: فَإِنِّي قَرِيبٌ ۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ الدَّاعِ إِذَا دَعَانِ
অর্থ: "আমি তো নিকটেই আছি। আহ্বানকারী যখন আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।"
🤲 যেভাবে দু‘আ করবেন: "হে পরম দয়ালু রব! আপনি নিজেই বলেছেন আপনি আমাদের অতি নিকটে আছেন এবং ডাকলে সাড়া দেন। তাই সমস্ত দুনিয়া ছেড়ে আজ আপনার অতি নিকটে এসে হাত পেতেছি, দয়া করে আমার খালি হাত ফিরিয়ে দেবেন না।"
৬. সূরা আল-ফাতিহা, আয়াত: ৫
আরবি: إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ
অর্থ: "আমরা শুধু আপনারই ইবাদত করি এবং শুধু আপনারই সাহায্য চাই।"
🤲 যেভাবে দু‘আ করবেন: "হে আল্লাহ! আমি সৃষ্টির মায়া ত্যাগ করে, কোনো মানুষের মুখাপেক্ষী না হয়ে, একমাত্র আপনারই দরবারে সাহায্য প্রার্থী। আপনি ছাড়া আমার আর কোনো সাহায্যকারী নেই।"
৭. সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ৮৭ (ইউনুস আলাইহিস সালাম-এর দু‘আ)
আরবি: لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
অর্থ: "আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই। আপনি পবিত্র। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।"
💡 বিপদে, কষ্টে ও গুনাহের বোঝা হালকা করার জন্য এটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।
৮. সূরা আদ-দুহা, আয়াত: ৫
আরবি: وَلَسَوْفَ يُعْطِيكَ رَبُّكَ فَتَرْضَى
অর্থ: "অচিরেই আপনার রব আপনাকে এত কিছু দেবেন যে আপনি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন।"
🤲 যেভাবে দু‘আ করবেন: "হে আল্লাহ! এই আয়াত আপনার হাবীব ﷺ-এর প্রতি নাযিল হলেও, আপনার অফুরন্ত ভাণ্ডারের প্রতি আমার সুধারণা জন্মেছে। আমাকে আপনার রহমত ও অনুগ্রহ থেকে এমন নেয়ামত দিন, যাতে আমি দুনিয়া ও আখিরাতে পুরোপুরি সন্তুষ্ট হয়ে যাই।"
▫️ মনের গভীর থেকে করার মতো আরও কিছু আকুল আবেদন:
“হে আল্লাহ! আপনি আমার সমস্ত প্রকাশ্য ও গোপন, জানা ও অজানা—সব গুনাহ আপনার বিশেষ রহমতে একেবারে মুছে দিন।”
“হে আল্লাহ! আমার অন্তরকে আপনার মহব্বত, আপনার ভয় এবং আপনার সার্বক্ষণিক স্মরণ দ্বারা পরিপূর্ণ করে দিন।”
“হে আল্লাহ! আমাকে এমন জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন, যেখানে আর কোনো দুঃখ, প্রিয়জনের বিচ্ছেদ কিংবা কোনো ভয় থাকবে না।”
“হে আল্লাহ! কিয়ামতের কঠিন দিনে ফেরেশতারা যেন আমাকে সুসংবাদ দিয়ে বলে—‘ভয় করো না, চিন্তিত হয়ো না; তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ করো’।”
“হে আল্লাহ! রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি আমার ভালোবাসা বাড়িয়ে দিন। তাঁর সুন্নাহকে আমার জীবনের অংশ বানিয়ে দিন এবং কিয়ামতের দিন তাঁর মোবারক হাত থেকে হাউজে কাওসারের পানি পান করার সৌভাগ্য দান করুন।”
“হে আল্লাহ! আমার হৃদয়ের সেই সব নীরব কষ্ট দূর করে দিন, যেগুলোর কথা আমি লজ্জায় বা অপাঙ্গে কাউকে বলতে পারি না।”
“হে আল্লাহ! আমার এমন সব দু‘আ কবুল করুন, যেগুলো আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারি না, কিন্তু আপনি তো আমার অন্তরের ভেতরের হাহাকারও খুব ভালো করে জানেন।”
“হে আল্লাহ! আমাকে এমন সময় মৃত্যু দিন যখন আপনি আমার উপর পুরোপুরি সন্তুষ্ট থাকবেন এবং আপনার সাথে সাক্ষাতের আনন্দ আমার হৃদয়ে থাকবে!”
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা এই বছরের আরাফাহর দিনটিকে আমাদের জীবনের সব অপূর্ণতা পূরণের, তথা “কুন, ফায়াকুন” এর উত্তম সময় হিসেবে কবুল করে নিন। আমীন ইয়া রব্বাল আলামীন!
📝 [লেখকের জন্য একটি বিশেষ দু'আ]:
"হে আমাদের প্রতিপালক! যিনি এই লেখাটি প্রস্তুত করে আমাদের আমলের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তাঁর জীবনের জানা-অজানা সকল গুনাহ খাতা ক্ষমা করে দিয়ে তাঁকে আপনার একান্ত আপন করে নিন। এবং হকীকী শাহাদাতের মর্যাদা নসীব করে পবিত্র মদীনার মাটিতেই প্রিয় নবীজী ﷺ-এর রওজা মোবারকের সবচেয়ে কাছে তাঁকে দাফন হওয়ার তাওফীক দান করুন। আমীন।"