14/08/2026
পোলট্রির মুরগিভাজা খেতে খেতেই নাহয় পোস্টটা একটু পড়ে ফেলুন। শেয়ার করতে ভুলবেননা কিন্তু!
পোল্ট্রির মুরগি, বিশেষ করে বাণিজ্যিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত ব্রয়লার মুরগি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। মূল উদ্বেগের জায়গাগুলো মূলত তিনটি: অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স (অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়া), হরমোন ও গ্রোথ প্রোমোটার এবং ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ।
নিচে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং শক্তিশালী কিছু গবেষণার রেফারেন্সসহ মূল প্রভাবগুলো তুলে ধরা হলো:
১. সুপারবাগ এবং অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স (Superbugs & Antibiotic Resistance)
বাণিজ্যিক পোল্ট্রি ফার্মগুলোতে মুরগিকে দ্রুত বড় করতে এবং রোগমুক্ত রাখতে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হয়। এর ফলে মুরগির শরীরে এমন কিছু ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়, যা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী (Superbugs)। এই মুরগি খাওয়ার মাধ্যমে বা ফার্মের সংস্পর্শে এসে মানুষের শরীরেও সেই রেজিস্ট্যান্স ছড়িয়ে পড়ে।
গবেষণা ও রেফারেন্স: The Lancet Infectious Diseases (2017)
গবেষণার বিষয়: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ল্যানসেটের একটি বড় গবেষণায় দেখা গেছে যে, পোল্ট্রি ও অন্যান্য গবাদি পশুতে অ্যান্টিবায়োটিকের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে মানুষের শরীরে E. coli এবং Salmonella এর মতো ব্যাকটেরিয়াগুলো প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। এর ফলে সাধারণ ইনফেকশনও এখন মারাত্মক আকার ধারণ করছে।
গবেষণা ও রেফারেন্স: Science (2019 - "Global trends in antimicrobial resistance in animals")
মূল তথ্য: এই গবেষণায় দেখা গেছে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে (যার মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া অন্যতম) পোল্ট্রি ফার্মে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের হার দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে টেট্রাসাইক্লিন ও পেনিসিলিনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ওষুধগুলো কার্যকারিতা হারাচ্ছে।
২. ক্রনিক ইনফেকশন এবং ইউটিআই (Urinary Tract Infections - UTI)
মুরগির মাংসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করা রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া সরাসরি বিভিন্ন ইনফেকশন তৈরি করতে পারে।
গবেষণা ও রেফারেন্স: American Society for Microbiology (mBio, 2023)
গবেষণার বিষয়: জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির গবেষকদের করা একটি বড় গবেষণায় দেখা গেছে, সুপারমার্কেটে বিক্রি হওয়া পোল্ট্রি মুরগির শরীরের E. coli ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ এবং মানুষের মারাত্মক ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (UTI)-এর ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ-র মধ্যে সরাসরি মিল রয়েছে। গবেষণার অনুমান, প্রতি বছর শুধুমাত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই হাজার হাজার ইউটিআই কেসের পেছনে দায়ী এই পোল্ট্রির ব্যাকটেরিয়া।
৩. ফুড পয়জনিং বা ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ (Foodborne Illness)
পোল্ট্রি প্রসেসিংয়ের সময় অসাবধানতার কারণে মুরগির মাংসে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থেকে যায়, যা মানুষের পেটের রোগের প্রধান কারণ।
গবেষণা ও রেফারেন্স: Centers for Disease Control and Prevention (CDC) & EFSA Report
মূল তথ্য: ইউরোপিয়ান ফুড সেফটি অথরিটি (EFSA) এবং সিডিসির রিপোর্ট অনুযায়ী, Campylobacter এবং Salmonella সংক্রমণের প্রধান উৎস হলো ঠিকমতো রান্না না করা পোল্ট্রির মাংস। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো মানুষের পরিপাকতন্ত্রে তীব্র সংক্রমণ, ডায়রিয়া এবং ক্র্যাম্প তৈরি করে।
৪. হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ও প্রারম্ভিক বয়ঃসন্ধি (Hormonal Imbalance & Early Puberty)
যদিও আধুনিক পোল্ট্রি বিজ্ঞানে সরাসরি হরমোন ইনজেকশন দেওয়ার বিষয়টি অনেক দেশে নিষিদ্ধ, তবুও কিছু বাণিজ্যিক ফার্মে দ্রুত বৃদ্ধির জন্য গ্রোথ প্রোমোটার বা কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। এছাড়া মুরগির স্ট্রেস হরমোনও মাংসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
গবেষণা ও রেফারেন্স: Journal of Clinical Research in Pediatric Endocrinology (2019)
গবেষণার বিষয়: এই গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ব্রয়লার মুরগি খাওয়া শিশুদের (বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের) ক্ষেত্রে "ইডিওপ্যাথিক প্রিকোসিয়াস পিউবার্টি" বা সময়ের আগেই বয়ঃসন্ধি আসার প্রবণতা বাড়ছে। মুরগির মাংসে থাকা এস্ট্রোজেন-সদৃশ উপাদান বা গ্রোথ কেমিক্যালকে এর জন্য আংশিক দায়ী করা হয়। অনেক কম বয়সে পিরিয়ড শুরু হওয়ার ঘটনা আশা করি প্রায়শই আজকাল শুনতে পান, তাই না?
সতর্কতা ও বাঁচার উপায়:
গবেষণাগুলো মূলত অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত পোল্ট্রি খাওয়ার নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে। তবে ভালো মানের ফার্মের মুরগি, যা সঠিক নিয়মে অ্যান্টিবায়োটিক মুক্ত রেখে পালন করা হয় এবং উচ্চ তাপমাত্রায় (কমপক্ষে ৭৪° সেলসিয়াস বা ১৬৫° ফারেনহাইট) ভালো করে রান্না করা হয়, তা ব্যাকটেরিয়াজনিত ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেয়(বলাই বাহুল্য এইধরণের "ভালো ফার্ম" নেই বললেই চলে)
ব্রয়লার মুরগির ফার্ম থেকে বীভৎস দুর্গন্ধ বেরোয়।
ব্রয়লার মুরগির ফার্মের তীব্র ও ঝাঁঝালো দুর্গন্ধের পেছনে মূলত নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিক ও পরিবেশগত কারণ রয়েছে। যে খাদ্য উৎপাদনেই এত দুর্গন্ধ, পরিবেশ যার এত দূষিত সেখান থেকে আসা খাদ্য মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা নিরাপদ?
নিচে দুর্গন্ধের বৈজ্ঞানিক কারণ এবং এটি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর কেমন প্রভাব ফেলে, তা বিশদভাবে আলোচনা করা হলো।
১. ফার্মে এত দুর্গন্ধ হওয়ার আসল কারণ কী?
ব্রয়লার ফার্মের দুর্গন্ধ কোনো সাধারণ পচনশীল গন্ধ নয়, এটি মূলত একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া। এর প্রধান কারণগুলো হলো:
অ্যামোনিয়া (NH_3) এবং হাইড্রোজেন সালফাইড (H_2S): মুরগির মল বা বিষ্ঠায় প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন এবং সালফার থাকে। ফার্মের মেঝেতে থাকা কাঠের গুঁড়ো বা তুষের (Litter) সাথে যখন এই মল মেশে, তখন সেখানে ব্যাকটেরিয়া ভাঙন শুরু করে। এই ভাঙনের ফলে বাতাসে তীব্র অ্যামোনিয়া এবং পচা ডিমের মতো গন্ধযুক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস ছড়ায়।
অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও গাদাগাদি পরিবেশ: বাণিজ্যিক ফার্মগুলোতে খুব ছোট জায়গায় হাজার হাজার মুরগি ঠাসাঠাসি করে রাখা হয়। মুরগির শ্বাস-প্রশ্বাস, মলমূত্র এবং পানের জল পড়ে মেঝে সবসময় স্যাঁতসেঁতে থাকে। পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের (Ventilation) অভাব হলে এই আর্দ্রতা গ্যাস তৈরির প্রক্রিয়াকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
উচ্চ প্রোটিনযুক্ত খাবার: ব্রয়লার মুরগিকে দ্রুত বড় করার জন্য যে ফিড (খাবার) দেওয়া হয়, তাতে প্রোটিনের পরিমাণ খুব বেশি থাকে। মুরগির পরিপাকতন্ত্র এই প্রোটিনের পুরোটা শোষণ করতে পারে না, ফলে মলের সাথে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন নির্গত হয়, যা গন্ধের তীব্রতা বাড়ায়।
২. যে খাবারে এত দুর্গন্ধ, তা কি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো?
সরাসরি বলতে গেলে—যে পরিবেশ থেকে এই তীব্র দুর্গন্ধ আসছে, সেই পরিবেশটি মুরগি এবং মানুষ উভয়ের স্বাস্থ্যের জন্যই ক্ষতিকর। তবে বিষয়টি একটু গভীরভাবে বোঝা দরকার:
ক) মুরগির মাংসের ওপর প্রভাব
তীব্র অ্যামোনিয়াযুক্ত বদ্ধ পরিবেশে থাকা মুরগিগুলো ক্রমাগত মানসিক ও শারীরিক চাপে (Stress) থাকে।
শ্বাসনালীর রোগ: এই গ্যাসের কারণে মুরগির ফুসফুস ও শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে তারা সহজেই বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসে আক্রান্ত হয়।
ওষুধের ওপর নির্ভরশীলতা: রোগ এড়াতে খামারিরা তখন আরও বেশি অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে বাধ্য হন। ফলে মাংসের পুষ্টিগুণ কমে যায় এবং ক্ষতিকর উপাদানের উপস্থিতি বাড়ে।
খ) খামারি ও আশেপাশের মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব
গবেষণায় দেখা গেছে, মুরগি খাওয়ার চেয়েও এই দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশের বাতাস মানুষের জন্য সরাসরি বেশি ক্ষতিকর।
Respiratory Medicine (2021) জার্নালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পোল্ট্রি ফার্মের কর্মী এবং আশেপাশের বাসিন্দাদের মধ্যে ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস, অ্যাজমা এবং ফুসফুসের কার্যকারিতা হ্রাসের হার অনেক বেশি।
বাতাসে ভেসে থাকা এন্ডোটক্সিন (Endotoxin) নামক এক ধরণের ব্যাকটেরিয়াল কণা ফুসফুসে তীব্র প্রদাহ তৈরি করে।
গ) মাংস রান্নার পর কি গন্ধের প্রভাব থাকে?
মুরগি সঠিকভাবে প্রসেস করার পর এবং উচ্চ তাপমাত্রায় রান্না করলে এই গ্যাসগুলো (অ্যামোনিয়া বা হাইড্রোজেন সালফাইড) মাংসে অবশিষ্ট থাকে না। তাই রান্না করা মাংস খেলে সরাসরি গ্যাসের বিষক্রিয়া হবে না। কিন্তু পরোক্ষ ক্ষতিটি রয়েই যায়—অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে বড় হওয়া মুরগির মাংসের গুণগত মান (Meat Quality) প্রাকৃতিকভাবে মুক্ত পরিবেশে বড় হওয়া মুরগির (যেমন দেশি মুরগি) চেয়ে অনেক কম হয়।
সারকথা:
দুর্গন্ধযুক্ত পোল্ট্রি ফার্ম মূলত ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা ও অতিরিক্ত বাণিজ্যিকীকরণের ফল। আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত 'বায়োসিকিউরিটি' এবং উন্নত ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা ব্যবহার করলে এই গন্ধ ৯০% পর্যন্ত কমানো সম্ভব। যে ফার্মে দুর্গন্ধ যত বেশি, বুঝতে হবে সেখানকার মুরগির স্বাস্থ্য এবং মাংসের মান ততটাই ঝুঁকিপূর্ণ।
আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গভীর এবং দূরদর্শী। দুই দশক বা তার কিছু আগে গ্রামীণ বা আধা-শহুরে জীবনে বাড়ির আঙিনায় মুক্ত অবস্থায় (Backyard Poultry) মুরগি পালনই ছিল প্রধান উৎস। সেখানে এমন তীব্র, দমবন্ধ করা পরিবেশ বা দুর্গন্ধ ছিল না।
তাহলে কেন এই আমূল পরিবর্তন? কেন একটি বিতর্কিত ও অস্বাস্থ্যকর জেনেও এই ইন্ডাস্ট্রিকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হলো? এর পেছনে বৈজ্ঞানিক, রাজনৈতিক এবং পুঁজিবাদের একটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট সমীকরণ রয়েছে।
চলুন, রাজনৈতিক-অর্থনীতি (Political Economy) এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার আলোকে এর ভেতরের সত্যটা বিশ্লেষণ করা যাক।
১. কেন এই ইন্ডাস্ট্রি আনা হলো? (বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট)
দুই দশক আগে মানুষ অবশ্যই মাংস খেত, তবে তা ছিল মূলত "উৎসবকেন্দ্রিক" বা সাময়িক। দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় মাংসের উপস্থিতি আজকের মতো ছিল না। এই ইন্ডাস্ট্রি প্রতিষ্ঠার পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল "সস্তা ও দ্রুত প্রোটিনের জোগান দেওয়া"।
জনসংখ্যা বিস্ফোরণ ও নগরায়ন: ২০ শতকের শেষভাগ থেকে বিশ্বজুড়ে (বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায়) জনসংখ্যা এবং নগরায়ন দ্রুত বাড়তে থাকে। প্রথাগত দেশি মুরগি ডিম থেকে বড় হতে ৫ থেকে ৬ মাস সময় নেয়। কিন্তু ল্যাবরেটরিতে জেনেটিক সিলেকশনের মাধ্যমে তৈরি ব্রয়লার মুরগি মাত্র ৩৫ থেকে ৪২ দিনে বিক্রির উপযোগী হয়ে যায়।
পুষ্টির রাজনীতিকীকরণ (Nutritional Policy): জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং বিভিন্ন দেশের সরকার অপুষ্টি দূর করতে এবং প্রোটিনের ঘাটতি মেটাতে "কম খরচে মাংস উৎপাদন"কে জাতীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করে।
বৈজ্ঞানিক স্টাডি: আন্তর্জাতিক জার্নাল World's Poultry Science Journal (2016)-এর একটি গবেষণায় দেখানো হয়েছে, কীভাবে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে 'ভার্টিক্যাল ইন্টিগ্রেশন' (Vertical Integration) মডেলের মাধ্যমে মুরগিকে একটি জৈবিক প্রাণী থেকে সম্পূর্ণ একটি "কারখানাজাত পণ্যে" রূপান্তর করা হয়েছে।
২. পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রির রাজনৈতিক কারণ (The Politics of Meat)
পোল্ট্রি খাতের প্রসারের পেছনে তীব্র ভূ-রাজনীতি এবং করপোরেট লবিং জড়িয়ে আছে। এর প্রধান রাজনৈতিক কারণগুলো হলো:
ভর্তুকি ও সস্তা ভুট্টার রাজনীতি (The Grain Lobby): আমেরিকা এবং ইউরোপে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো (যেমন Cargill, ADM) বিপুল পরিমাণে ভুট্টা এবং সয়াবিন উৎপাদন করে। এই অতিরিক্ত শস্যের বাজার তৈরি করার জন্য পোল্ট্রি ফিড (মুরগির খাবার) একটি আদর্শ খাত হয়ে দাঁড়ায়। পশ্চিমা দেশগুলো তাদের সয়াবিন ও ভুট্টা এশিয়ার বাজারে রপ্তানি করার জন্য এই অঞ্চলের পোল্ট্রি শিল্পকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতিমালার মাধ্যমে উৎসাহিত করে।
খাদ্য নিরাপত্তা বনাম খাদ্য সার্বভৌমত্ব: রাষ্ট্রগুলোর কাছে "খাদ্য নিরাপত্তা" (Food Security) মানে হলো মানুষের থালায় সস্তায় খাবার পৌঁছে দেওয়া, তা সেটার মান যতই খারাপ হোক না কেন। এতে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ কম থাকে। কিন্তু এর ফলে "খাদ্য সার্বভৌমত্ব" (Food Sovereignty) বা স্থানীয় কৃষকের নিজস্ব পদ্ধতিতে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের অধিকার খর্ব হয়।
৩. এই উৎপাদনের ক্ষমতা কাদের হাতে? কারা মুনাফা করে? এই ক্ষমতার মালিক কারা?
বর্তমান পোল্ট্রি শিল্প আর পাঁচটা সাধারণ কৃষিকাজের মতো স্বাধীন নয়। এটি সম্পূর্ণভাবে করপোরেট নিয়ন্ত্রিত।
ক) গ্লোবাল মনোপলি (বীজ ও ফিডের নিয়ন্ত্রণ):
ব্রয়লার মুরগির যে বাচ্চা (Chicks) খামারিরা লালন-পালন করেন, তার "প্যারেন্ট স্টক" মাত্র দু-তিনটি বৈজ্ঞানিক বহুজাতিক কোম্পানির হাতে বন্দি (যেমন: Aviagen এবং Cobb-Vantress)। অর্থাৎ, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের খামারি চাইলেও নিজে থেকে ব্রয়লার মুরগির বংশবৃদ্ধি করতে পারবেন না। প্রতিবার তাকে এই করপোরেটদের কাছ থেকেই বাচ্চা কিনতে হবে।
খ) চুক্তিবদ্ধ চাষ বা কন্ট্রাক্ট ফার্মিং (Contract Farming):
আজকাল স্থানীয় ছোট খামারিরা স্বাধীন নন। Tyson Foods (আমেরিকা) কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার বড় বড় করপোরেট গ্রুপগুলো কন্ট্রাক্ট ফার্মিং মডেল চালায়।
কর্পোরেটদের নিয়ন্ত্রণ: কোম্পানি খামারিকে বাচ্চা, ফিড এবং ওষুধ দেয়। খামারি শুধু শ্রম ও তার জমি ব্যবহার করে মুরগি বড় করেন।
মুনাফার বণ্টন: মুরগি বিক্রির সিংহভাগ মুনাফা চলে যায় করপোরেটদের পকেটে। আর তীব্র দুর্গন্ধ, বর্জ্যের পরিবেশগত ক্ষতি এবং রোগব্যাধির সমস্ত ঝুঁকি বহন করতে হয় স্থানীয় খামারি ও সেই এলাকার সাধারণ মানুষকে। পোলট্রি ফার্ম আছে এমন যে কোনও জায়গার মানুষের সঙ্গে কথা বললে বুঝতে পারবেন।
বৈজ্ঞানিক ও সমাজতাত্ত্বিক স্টাডি: প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী উইলিয়াম এইচ. ফ্রাইডল্যান্ড (William H. Friedland) এবং ফিলিপ ম্যাকমাইকেল (Philip McMichael)-এর "গ্লোবাল ফুড রেজিমস" (Global Food Regimes) তত্ত্বের ওপর করা গবেষণাগুলো স্পষ্ট দেখায় যে, কীভাবে বিশ্বায়নের যুগে কৃষিপণ্যের উৎপাদন ক্ষমতা কৃষকের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে মুষ্টিমেয় গ্লোবাল এলিট ও বহুজাতিক পুঁজিপতিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
সারসংক্ষেপ:
দুই দশক আগের ব্যবস্থায় পুষ্টির কোনো ঘাটতি ছিল না, কারণ তখন মানুষের খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য ছিল (স্থানীয় মাছ, শাকসবজি, ডাল এবং দেশি পশুপাখি)। পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রির আসল উদ্দেশ্য জনকল্যাণ নয়, বরং পুঁজিবাদের এমন এক চেইন তৈরি করা, যেখানে ফিড প্রস্তুতকারক, ওষুধ কোম্পানি এবং মাংসের করপোরেট জায়ান্টরা প্রতি মুহূর্তে কোটি কোটি ডলার মুনাফা করতে পারে, যার মূল্য দিতে হচ্ছে মানুষের স্বাস্থ্য এবং আমাদের পরিবেশকে। পুষ্টির যোগান? নাকি ডিপ ফ্রাই করে হাজারে হাজারে ফ্রোজেন ভাজা মাংস মানুষকে খেতে প্রলোভিত করা? আপনার শহর মফস্বলের অজস্র রেস্ত্রোঁ, ডিপ ফ্রায়েড চিকেন এর কাউন্টারে হামলে পড়া ভীড় দেখে কী মনে হয়? যারা রাতদিন এসব খাচ্ছে তাদের টাকার অভাব? তারা পুষ্টির জন্য ওসব খেতে এসেছে?
আর একটা কথা, শেষ কবে ঘরোয়া পদ্ধতিতে পালিত মুরগির ডিম মাংস খেয়েছেন? ওই ডিম মাংসের স্বাদ আর দুর্গন্ধ ভরা পোল্ট্রির মুরগির ডিম মাংসের স্বাদের ফারাক কতখানি?