21/04/2026
পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুর—আজকের দিনে যার নাম উচ্চারণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কারখানার ধোঁয়া, আলো ঝলমলে রাস্তা আর ব্যস্ত জীবনের ছন্দ—সেই শহরের জন্মকথা কিন্তু একেবারেই অন্যরকম। এই গল্প শুরু হয় অনেক অনেক বছর আগে, যখন এই পুরো অঞ্চলটাই ছিল গভীর জঙ্গলে ঢাকা, যেখানে দিনের আলোও মাটিতে ঠিকমতো পৌঁছাতে পারত না, আর মানুষের পদচিহ্ন ছিল বিরল। বাতাসে ছিল অজানা ভয়, আর রাত নামলেই চারদিক যেন রহস্যে ঢেকে যেত।
১৭৬৫ সালের দিকে, বাঁকুড়ার জগন্নাথপুর গ্রামের গোপীনাথ চট্টোপাধ্যায় একদিন বেরিয়ে পড়লেন বর্ধমানের রাজার কাছে শেখ বা রাজস্ব জমা দিতে। দায়িত্ব ছিল বড়, আর সেই দায়িত্ব পালন করতেই তাঁকে পাড়ি দিতে হয়েছিল সেই ভয়ঙ্কর জঙ্গলময় পথ। দিনের আলো ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসছিল, আর তিনি যত এগোচ্ছিলেন, ততই জঙ্গল যেন ঘন হয়ে উঠছিল। চারপাশে পাখির ডাক থেমে গিয়ে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছিল—যেন কিছু একটা ঘটতে চলেছে।
হঠাৎই সেই নীরবতা ভেঙে গেল। অন্ধকারের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল একদল ডাকাত। চোখে লোভ, হাতে অস্ত্র—তারা মুহূর্তের মধ্যে ঘিরে ফেলল গোপীনাথকে। প্রতিরোধ করার মতো কিছুই ছিল না তাঁর কাছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁর সমস্ত কিছু লুট হয়ে গেল—টাকা, সামগ্রী, সব। তিনি প্রাণে বেঁচে গেলেন ঠিকই, কিন্তু হয়ে গেলেন সম্পূর্ণ নিঃস্ব। সেই গভীর জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে তিনি বুঝলেন—এক মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে যেতে পারে।
ক্লান্ত, আহত আর ভাঙা মন নিয়ে তিনি কোনোভাবে পৌঁছালেন বর্ধমানের রাজদরবারে। সেখানে গিয়ে তিনি সব খুলে বললেন—কীভাবে জঙ্গলের মধ্যে তাঁর সর্বস্ব লুট হয়েছে। তাঁর কথা মন দিয়ে শুনলেন বর্ধমানের মহারাজা। তিনি শুধু একজন শাসক ছিলেন না, তিনি ছিলেন দূরদর্শী। তিনি বুঝতে পারলেন, এই জঙ্গল শুধু বিপদের জায়গা নয়—এটি একদিন এক বিশাল জনপদে পরিণত হতে পারে।
তখনই তিনি এক অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি গোপীনাথকে সেই জঙ্গলমহলের একাংশ ইজারা হিসেবে দিয়ে বললেন—“তুমি এখানেই বসতি গড়ে তোলো, এই অরণ্যকে মানুষের বসবাসের জায়গা বানাও।” কথাটা শুনে গোপীনাথ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে ছিলেন। যে জায়গা তাঁর সর্বনাশের কারণ হয়েছিল, সেই জায়গাই আবার তাঁর ভবিষ্যৎ হয়ে উঠতে পারে—এই ভাবনাটা সহজ ছিল না। কিন্তু তাঁর ভেতরে ছিল এক অদম্য সাহস। তিনি ভয়কে হার মানালেন।
তিনি ফিরে এলেন সেই জঙ্গলে—কিন্তু এবার একা নন, সঙ্গে ছিল স্বপ্ন আর দৃঢ় সংকল্প। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর তিনি জঙ্গল কাটতে লাগলেন, জমি পরিষ্কার করতে লাগলেন, মানুষ ডেকে আনলেন। ধীরে ধীরে সেই ভয়ংকর জঙ্গল বদলে যেতে লাগল। গাছের জায়গায় উঠল সুন্দর ঘর, শূন্যতার জায়গায় ভেসে উঠল মানুষের কণ্ঠস্বর, হাসি আর জীবনের সুর। এইভাবে গড়ে উঠল এক নতুন গ্রাম—গোপীনাথপুর।
সময় এগিয়ে চলল, আর গোপীনাথের সেই স্বপ্নকে আরও বড় করে তুললেন তাঁর বংশধর দুর্গাচরণ চট্টোপাধ্যায়। তিনি শুধু বসতি নয়, এক সমাজ গড়ে তুললেন। ১৭৯৩ সালে তিনি একটি কালী মন্দির নির্মাণ করলেন, ১৮০৩ সালে তৈরি হলো শিব মন্দির। এই মন্দিরগুলো শুধু পূজার জায়গা ছিল না—এগুলো হয়ে উঠেছিল মানুষের মিলনস্থল, যেখানে সবাই একসঙ্গে আসত, কথা বলত, সম্পর্ক গড়ত। ধীরে ধীরে এই জায়গা এক প্রাণবন্ত জনপদে পরিণত হলো। মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল দুর্গাচরণের নাম। সবাই বলতে শুরু করল—“এটা দুর্গাচরণের পুর।” আর সেই নামই সময়ের সঙ্গে হয়ে গেল—দুর্গাপুর।
এই গল্পে আরও একটি রহস্যময় অধ্যায় আছে, যা আজও মানুষ বিস্ময়ের সঙ্গে বলে। এক সন্ধ্যায়, পুকুরপাড়ে বসে ছিলেন এক শাঁখারি। হঠাৎ এক বধূ এসে তাঁর কাছে শাঁখা পরতে চাইলেন। শাঁখা পরানোর পর দাম চাইলে তিনি মৃদু হেসে বললেন—“চট্টোপাধ্যায়দের বাড়ির কুলুঙ্গিতে রাখা আছে।” এই বলে তিনি চলে গেলেন। পরে যখন সেই বাড়িতে গিয়ে দেখা হলো, সত্যিই সেখানে শাঁখা-সিঁদুর পাওয়া গেল। সেই রাতেই পরিবারের সদস্যরা স্বপ্নে মা দুর্গার দর্শন পেলেন। দেবী তাঁদের আদেশ দিলেন—“আমাকে এখানে প্রতিষ্ঠা করো, পুজো করো।” সেই থেকেই শুরু হলো সেই ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজো, যা প্রায় তিনশো বছর ধরে আজও চলে আসছে।
সময় গড়াতে গড়াতে এই পুজো হয়ে উঠল এক বিশাল উৎসব। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসত, নবমীর দিনে অন্নভোগ খেত, দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলত সেই ভোজ। ঢাকের আওয়াজে আকাশ মুখরিত হতো, আলোয় ভরে উঠত চারদিক। একসময় মহিষ বলির প্রথাও ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলেছে। তবুও কিছু নিয়ম আজও অটুট—নবমীর দিনে লাউয়ের তরকারি, আর দশমীতে চিঁড়ে ও চ্যাং মাছ পোড়া ভোগ হিসেবে দেওয়া হয়।
এরপর এল ১৮৫৫ সাল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই অঞ্চলে রেলপথ স্থাপন করল। নতুন স্টেশন তৈরি হলো, আর সেই স্টেশনের নাম রাখা হলো “দুর্গাপুর।” এই প্রথমবার নামটি সরকারি স্বীকৃতি পেল। গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড-এর কাছাকাছি হওয়ায় এই অঞ্চল দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। মানুষ বাড়ল, ব্যবসা বাড়ল, জীবন আরও গতিশীল হয়ে উঠল।
তারপর এল ১৯৪৭—দেশ স্বাধীন হলো। সময় আবার বদলাল। বিধানচন্দ্র রায়-এর পরিকল্পনায় দুর্গাপুরে গড়ে উঠল এক বিশাল শিল্পনগরী। ১৯৫০ থেকে ১৯৬০-এর মধ্যে তৈরি হলো স্টিল প্ল্যান্ট, কারখানা, আধুনিক রাস্তা। যে জায়গায় একসময় জঙ্গল ছিল, সেখানে আজ দাঁড়িয়ে আছে এক আধুনিক শহর।
তবুও, এত পরিবর্তনের মাঝেও কিছু গল্প কখনও মুছে যায় না। শরৎ এলেই, ঢাকের শব্দ উঠলেই, ধূপের গন্ধ ভেসে এলেই—মনে হয় সেই পুরনো সময় আবার ফিরে এসেছে। চট্টোপাধ্যায় বাড়ির আঙিনায় আজও মা দুর্গা বসেন, একই ভক্তি, একই নিয়মে। পরিবারের মানুষরা, যারা পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে, তারা এই কয়েকটা দিনের জন্য ফিরে আসে নিজেদের শিকড়ে।
দুর্গাপুর তাই শুধু একটি শহর নয়। এটি এক দীর্ঘ যাত্রার গল্প—একটি ডাকাতির রাত থেকে শুরু করে এক শিল্পনগরীর উত্থান পর্যন্ত। এটি এক মানুষের সাহস, এক পরিবারের বিশ্বাস, আর সময়ের পরিবর্তনের এক অনন্য কাহিনি। এই গল্প আজও বেঁচে আছে—প্রতিটি পূজোর আলোয়, প্রতিটি ঢাকের আওয়াজে, আর প্রতিটি মানুষের মনে। লেখাটি যদি কোন ভুল হয়ে থাকে দয়া করে ক্ষমা করে দিবেন।