16/03/2025
আগে দাম তত লাফাত না এখন শুধুই লাফায়
আজকাল পত্রিকার বাজার সফর এর নির্বাচিত কলামে
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছিলেন ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ সাল দক্ষিণ কলকাতায় যে-বাড়িতে ভাড়া ছিলেন, সেই বাড়িটি ছিল স্বামী বিবেকানন্দের মাসতুতো ভাইয়ের এক নাতির বাড়ি। তিনি তাঁদের পারিবারিক অনেক পুরনো ছবি, বই, চিঠিপত্র ওনাকে দেখতে দেন। ওঁরা আত্মীয়তা-সূত্রে আবার গোবিন্দ মিত্রের বংশধর, যে গোবিন্দ মিত্র প্রাচীন কলকাতার ইতিহাসে জন কোম্পানির আমলের ব্ল্যাক জমিনদার হিসেবে পরিচিত হন এবং কলকাতার প্রথম পুলিসও ছিলেন তিনিই। সে সব প্রায় আড়াইশো বছর আগের কথা।
ওইসব পুরনো বই আর চিঠিপত্রের ভেতর বাজারের হিসেব লেখা একখানি খাতা পেয়েছিলেন। ওই বাড়িরই কেউ সম্ভবত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছিলেন। খাতায় কোনও
নাম লেখা নেই। ভদ্রলোক রিটায়ার করার পর দৈনিক বাজারের হিসেব লিখে রাখতেন।
খাতাখানিতে বাজারের যে হিসেব পেয়েছিলেন, তা হল — ১৯৩০ সালের আগস্ট থেকে ১৯৩৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তার মানে একটানা প্রায় সাড়ে আট বছরের হিসেব। ভদ্রলোক টাকা, আনা, পাইয়ে হিসেব লিখেছেন।
১২ পাইয়ে এক আনা হত। ৩ পাইয়ে ১ পয়সা। ৪ পয়সায় ১ আনা। ১৬ আনায় ৬৪ পয়সা বা ১ টাকা।
দশমিক হিসেব চালু হয়েছে ১৯৫৭ সালে। আজ থেকে ৬৮ বছর আগে রিটায়ার্ড ভদ্রলোক প্রতি মাসে পেনশন পেতেন ১০৬ টাকা ২ আনা। প্রতি মাসের হিসেবের গোড়ায় তিনি লিখেছেন— পেনশন পেলাম ১০৬ টাকা ২ আনা। সেই সময় এত টাকা পেনশন দেখে মনে হয়, তিনি সম্ভবত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের মতো কোনও উঁচু পদে চাকরি করতেন। হিসেব লিখেছেন আগাগোড়াই ইংরেজিতে।
একটানা সাড়ে ৮ বছরের হিসেব পড়ে একটা জিনিস লক্ষ্য করা যায় এই সাড়ে ৮ বছরে প্রায় কোনও জিনিসেরই দাম লাফ দিয়ে দিয়ে বাড়েনি। অথচ এখন বাজারে জিনিসের দাম বছরে ৪-৫ বার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে। উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে।
আগস্ট ১৯৩০– পেনশন ১০৬ টাকা ২ আনা,
কেরোসিন- ১ গ্যালন: ১১ আনা ৬ পাই,
আধ সের চিনি- ২ আনা ৩ পাই,
দৈনিক বাজার- ৭ আনা ৬ পাই,
আধ সের সরষের তেল এবং
সওয়া সের চিনি- ৬ আনা ৬ পাই,
ছোলার ডাল- ১ সের - ২ আনা,
স্ত্রীর জন্য মিষ্টি- ২ ১৭০ আনা,
স্ত্রীর জন্য খাবার-৫ আনা ৬ পাই,
জিলিপি এবং ঘুঁটে- ৩ আনা ৩ পাই,
আটা আড়াই সের এবং সুজি- ৫ আনা ৩ পাই,
সানলাইট সাবান- ২ আনা ৯ পাই,
সরষের তেল এবং ঘি-১৩ আনা,
দৈনিক বাজার ও দাড়ি কামানো- ৭ আনা,
নারকেল তেল এবং নুন- ৩ আনা,
চশমা সারানো- ২ আনা,
চিনি ও মশল্লা- ২ আনা।
দৈনিক বাজার দেখছি ৭ আনা থেকে ১৩ আনার ভেতর। ভদ্রলোক বাজার করতে গিয়ে দাড়ি কামিয়ে আসতেন।
ট্রামে এসপ্ল্যানেড ও ওয়েলিংটনে গিয়েছিলেন তিনি। যাতায়াত ২ আনা ৩ পাই ।
ডিসেম্বর ১৯৩০—
ইলেকট্রিক বিল- ৩ আনা ৬ পাই,
গাওয়া ঘি, পাউরুটি এবং চিনি- ৫ আনা,
এক জোড়া সাদা ধুতি- ২ টাকা ৩ আনা,
১ মন কয়লা- ৯ আনা।
আগস্ট ১৯৩১–
বাজার খরচ- ৯ আনা,
কলগেট টার্কিস বাথসোপ- ৬ আনা ৬ পাই,
স্ত্রীকে ধারশোধ ২ টাকা ২ আনা,
আটা, চিনি ও সন্দেশ- ৬ আনা,
১৫ সের চাল- ২ টাকা ৬ আনা,
১ মন কয়লা- ৮ আনা (দাম আগের চেয়ে ১ আনা কমে গেছে।)
কোনও কোনও দিন দৈনিক বাজার ৪ আনা ৬ পাইয়ে নেমে এসেছে।
জানুয়ারি ১৯৩২ –
স্ত্রীর জন্য শাড়ি- ২ টাকা ১৫ আনা,
নিজের জন্য থান কাপড়- ৩ টাকা ৩ আনা,
মশারির কাপড়- ১ টাকা ২ আনা,
বাবার শ্রাদ্ধের কাপড়- ১৪ আনা,
সরষের তেল, ডাল ও আটা- ৫ আনা,
চা হাফ পাউন্ড- ৪ আনা,
গাওয়া ঘি এবং
হিন্দুস্থান আটা- ১৪ আনা।
এপ্রিল ১৯৩৪–
এক পোয়া নারকেল তেল- ১ আনা ৯ পাই,
সওয়া সের মধু- ৬ আনা,
স্ত্রীকে হাত খরচ- ৩ আনা,
৫০টি আম- ৮ আনা,
৪০০ ঘুঁটে- ৩ আনা ৩ পাই,
জানুয়ারি ১৯৩৫–
আটা আনা হত কোনও এক বসু মশায়ের দোকান থেকে। কয়লা আনা হত কোনও এক রাম মশায়ের দোকান থেকে। তাই দাম লেখা নেই।
দই এবং মিষ্টি- ১৩ আনা।
ফেব্রুয়ারি ১৯৩৬–
চা ও পাউরুটি- ৩ আনা,
স্ত্রীর জন্য কাপড়- ২ টাকা ৫ আনা ৬ পাই,
মশলা- ২ আনা ৩ পাই,
অলিভ অয়েল- ১২ আনা,
২৫টি আম- ৪ আনা।
জানুয়ারি ১৯৩৭–
বিস্কুট ও পাউরুটি- ৩ আনা,
দাড়ি কামানোর সাবান- ৩ আনা,
সওয়া সের ডাল- ৫ আনা,
ট্রেনে ৪টি পেয়ারা খেলাম- ১ আনা,
২০০ ঘুঁটে- ২ আনা,
সাবান ও রুটি- ৫ আনা ৬ পাই,
খোকার জন্য জুতো- ৮ আনা।
আটা ও চিনি- ৩ আনা ৩ পাই,
আটা আড়াই সের- ৬ আনা ।
মে ১৯৩৮ –
লাল আটা, সুজি ও চিনি- ৮ আনা,
লাল চিনি- ৩ আনা,
পাউরুটি, চিনি ও দুধ- ৭ আনা,
নারকেল তেল- ১ আনা ৬ পাই,
স্ত্রীকে হাত খরচ- ৮ আনা,
২৫টি আম- ৬ আনা।
ওই সাড়ে ৮ বছরে ভদ্রলোকের দৈনিক বাজার খরচ ৪ আনা থেকে ১ টাকার ভেতর ছিল।
তরিতরকারি, মাছ, মাংস, ডিমের দাম লেখেননি তিনি। কারণ, ওসবই দৈনিক বাজার খরচের ভেতর ধরা আছে। তিনি খুব পাউরুটি খেতেন। প্রায়ই পাউরুটি ও ডালপুরির কথা লেখা আছে।
কয়লা ও মাসকাবারি জিনিস মুদির কাছ থেকে আনা হত বলে বিশদে লেখা নেই।
দেখা যাচ্ছে, ১৯৩০-১৯৩৮ আটা, চিনি, ডাল, কেরোসিন, ঘুঁটে, কাপড় ইত্যাদির দাম প্রায় একইরকম ছিল।
এবার দাম এই ক বছরে কতটা বেড়েছে? আমার বাবার হিসাবে
সাল ১৯৯১ - পেনশন ৩০০০ টাকা
সরষের তেল ৩৪, ৩৬, ৩৮, ৪০, ৪২, ৪৫ টাকা। কোনও কোনও দোকানে এখন ৫০ টাকা। রাইস
অয়েল ৩৬ টাকা থেকে বেড়ে এখন ৪৬ টাকা।
আস্ত হলুদের কেজি ৩০ টাকা থেকে বেড়ে
এখন ৫০ টাকা।
সবচেয়ে বেড়েছে পোস্তর দাম। এক বছর আগে কেজি ছিল ৯০ টাকা। এখন কেজি ২০০ টাকা।
আস্ত জিরে ৭০ টাকা থেকে বেড়ে ১০০ টাকা। শুকনো লঙ্কা ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৮০ টাকা।
মুসুর ২৩ টাকা থেকে বেড়ে ৩০ টাকা। মুগ ২৬ টাকা থেকে
বেড়ে ৩৭ টাকা, অড়হর ২১ টাকা থেকে বেড়ে ৩৩ টাকা।
চিনি ১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৭ টাকা ৫০ পয়সা। বাতাসা ১৮ টাকা থেকে বেড়ে ২৪ টাকা।
একসেল গুঁড়ো সাবান ৪৬ টাকা থেকে বেড়ে ৫৮ টাকা। ডাভ সাবান ৩৭ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ৪৪ টাকা।
ক্লোজআপ পেস্ট ২৮ টাকা থেকে বেড়ে ৩২ টাকা। বাটিকা মাথার তেল এখন ৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৫৮ টাকা।
এবার সাল ২০১৯ - পেনশন ২২০০০ টাকা
বাবার হিসাবের খাতা ছিল, শুধুই কাঁচা বাজার, দুই হাতে বাজার করতেন রোজ।
মা'র ও সমান পেনসন। সংসারের বাকি সব মা সামলাতেন । তবে কখনও হিসাব রাখতে দেখিনি। রাখলে দৈনন্দিন জিনিষ, সোনার দাম, জামাকাপড়ের খরচ, লোক লৌকিকতা, ওষুধ বিষুধ, স্কুল কলেজ ও মেয়েদের বিবাহের হিসাবটা পাওয়া যেতো, কেমন ছিল ।
বাবার মৎস্যপ্রীতি বাজার বিখ্যাত । দৈনিক তিন চার রকম মাছ বাড়িতে আসতই সে নিজে খাক বা না খাক।
দরের নমুনা টা রইলো
বাজারে -
আপেল ১২০ টাকা কেজি,
মৌসম্বী ৪০ টাকা কেজি,
আনারস ৪০ টাকা প্রতিপিস,
পেয়ারা ৪০ টাকা কেজি,
পানিফল ২৫ টাকা কেজি,
আখ প্রতিপিস ২০ টাকা,
নারকেল ৩০ টাকা পিস,
ডাব প্রতি পিস ৩০ টাকা,
মাছ প্রতি কেজি
রুই - ১৫০-২৫০
কাতলা - ১৮০-২২০
রুই - ১৩০-২০০
মৃগেল - ১২০-১৬০
সিলভারকার্প - ১০০-১৩০
টেংরা - ১০০-১২০
পুঁটি - ১২০-১৪০
বোয়াল - ১৩০-১৬০
পাঙ্গাস - ১২০-১৫০
বাটা - ৮০-১২০
মাগুর - ১৮০-৩০০
সিঙ্গী - ২০০-৩০০
তেলাপিয়া - ২০০
ছোট ট্যাংরা - ১৫০
ভোলা - ২০০ মাঝারি
পাবদা - ৩০০ টাকা থেকে শুরু
লোটে - ১০০
পারসে - ২০০ টাকা বড়
গলদা চিংড়ি - ৫০০
বাগদা-চিংড়ি - ২৫০
আলু (জ্যোতি) - ১৫ টাকা কেজি
আলু (চন্দ্রমুখী) - ২২ টাকা কেজি
ফুলকপি - জোড়া ১২ টাকা
বাঁধাকপি - জোড়া ১৫ টাকা
উচ্ছে - ৩০ টাকা কেজি
ওলকপি - ২০ টাকা কেজি
পেঁয়াজকলি - ৩০ টাকা কেজি
পেঁয়াজ - ৩০ টাকা কেজি
বেগুন - ৩৫ টাকা কেজি
টমেটো - ৩০ টাকা কেজি
কাঁচা টমেটো - ৪০ টাকা কেজি
মোচা - ২০ টাকা (মাঝারি আকার)
পটল - ৪০ টাকা কেজি
সিম - ২৫ টাকা কেজি
বরবটি - আঁটি ১৫ টাকা
কড়াইশুঁটি - ৩০ টাকা কেজি
পেঁপে - ৮ টাকা
লেবু - ২ টাকা পিস
পালং শাক - ১০ টাকা আঁটি
মাটন কেজি প্রতি মাংসের দাম ৫০০ টাকা থেকে শুরু ছিল। কলকাতায় মুরগি মাংসের দাম বাড়ছে এই সময় থেকে ব্রয়লার মুরগী ১২০ ও দেশি মুরগি ২৫০ টাকা কেজি
#বাঙালি
#কলকাতা
#খাদ্যরসিক
#ফেসবুক